নিজেকে অভিজাত মনে হয়।

রাশেদুল ইসলাম
(দশ)

আভিজাত্যের সাথে ক্ষমতার নিবিড় সম্পর্ক । আভিজাত্য সাধারণত ক্ষমতা কেন্দ্রিক হয়ে থাকে । তবে আভিজাত্যের স্বরূপ ক্ষমতার মান নির্ধারণ করে । আভিজাত্যের সাথে শিক্ষা যোগ হলে ক্ষমতা মহিমান্বিত হয় । মোগল সম্রাট আকবর নিরক্ষর ছিলেন । কিন্তু তাঁর শিক্ষানুরাগ এবং সভাসদে ‘নবরত্ন’দের যথাযথ মর্যাদায় ব্যবহার আকবরের শাসনকালকে গৌরবান্বিত করেছে । আকবর হয়েছেন ‘মহান আকবর’, ‘Akbar the Great’ ।
আমি তিন নেতার মাজার পার হয়েছি । দোয়েল চত্বর পার হয়ে কার্জন হলের মাঠে পা দিয়েই শিক্ষার সাথে ক্ষমতার সম্পর্কের কথা মনে পড়ে আমার । লর্ড কার্জন ১৮৯৯ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় ছিলেন । ১৯০৪ সালে তিনি এখানে ঢাকা টাউন হলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন । কিন্তু ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে এই টাউন হলকেই তাঁর স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল নামকরণ করা হয় । এই কার্জন হলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদ চালু হয় ।
আমি কার্জন হল থেকে বেরিয়ে আসি । বাদিকের বাংলা একাডেমী, আণবিক শক্তি কমিশন, টি এস সি ও রোকেয়া হল ছাড়িয়ে অপরাজেয় বাংলার মুখোমুখি আমি । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস আমার মাথায় ঘুরপাক খায় ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে লর্ড কার্জন ক্ষমতায় ছিলেন না । কিন্তু ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটা নতুন প্রদেশ গঠনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বাংলায় গণজাগরণ তৈরি করেন । এই নতুন প্রদেশের রাজধানী হয় ঢাকা । বঙ্গভঙ্গের এই রাজনৈতিক ঘোষণার এক ধাক্কায় পূর্ববঙ্গ জেগে উঠে । বাংলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হার বেড়ে যায় ৮২.৯% (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ২০০৭) । পূর্ববাংলার মুসলমানদের মধ্যে এই ধারণা জন্মে যে, বঙ্গভঙ্গের কারণে তাঁদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়ে যাবে । কিন্তু কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের প্ররোচনায় বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয় । কিশোর ক্ষুদিরাম বসুর মত অনেকেই এই আন্দোলনে আত্মাহুতি দেন । শেষ পর্যন্ত ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় । সে সময় পূর্ববাংলার মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এবং ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ এঁর বারংবার চাপেই মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় । আর এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা উঠতেই কলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ প্রথমে ব্যঙ্গ এবং পরে তীব্র বিরোধিতা শুরু করে ।

ব্যঙ্গের কথাই আগে বলি । সরকার শাহাবুদ্দিন আহমেদ রচিত ‘ইতিহাসের নিরিখে রবীন্দ্র- নজরুল চরিত’ লেখা থেকে জানা যায় যে, কলকাতার হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা বলেন, ঢাকায় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ হবে না, হবে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ । তাঁরা আরও বলেন, “পূর্ববাংলার মুসলমানদের কালচার নেই । এদের কালচার হচ্ছে এগ্রিকালচার” ।

কোন ব্যঙ্গই অর্থহীন হয় না । প্রত্যেক ব্যঙ্গ্যের একটি অন্তর্নিহিত অর্থ থাকে । এখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ না বলে ‘মক্কা বিশ্ববিদ্যালয়’ বলা হয়েছে । তারমানে ব্যঙ্গ করা হয়েছে ‘মক্কা’ কে । যে মক্কার বিচ্ছুরিত আলোয় মক্কার অন্ধকার কেটে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, সেই মক্কার আলোর জ্যোতিতে এমন কি ঘটল যা – উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্যঙ্গে পরিণত হোল ? আবার যে বাংলা মোঘল আমলে সমুদ্রগামী জাহাজ ও বস্ত্র শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল, সেই বাংলার এমন কি ঘটল যে, ইংরেজ শাসনের শেষ দিকে সেই বাংলার একমাত্র কালচার হোল এগ্রিকালচার ? এ বিষয়ে বোধহয় একটু পিছনে ফিরে দেখা দরকার ।
ইসলাম অতি প্রগতিশীল ধর্ম । হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ৬১০ সালের দিকে যে দাসমুক্তির কথা বলেন; সেইকথা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বলেন ১২৫২ বছর পরে ১৮৬৩ সালে তাঁর গেটিসবারগের ভাষণে । ৬২২ সালে মহানবী (সঃ) মদিনায় যে আদর্শ ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, এখনও তা অনুকরণীয় । কিন্তু পবিত্র কোরআনের মর্ম অনুযায়ী সহজাত বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী হিসাবে জ্ঞানচর্চা করে সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়া মুসলমানরা পরে আর অনুসরণ করেননি । ফলে তাঁরা অনেক পিছিয়ে গেছেন । সংগত কারণেই মুসলমান প্রধান পূর্ববাংলায় যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা উঠেছে, অর্থ ও শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মুসলমানদের কোলকাতার উচ্চবর্ণের বা উঁচু তলার হিন্দুরা তখন ব্যঙ্গ করেছে । এ দোষ হিন্দুদের নয়; বরং এই দোষ মুসলমানদের । আর এই দোষ শুধু বাংলা তথা ভারতের মুসলমানদের নয়; এই দোষ আরবীয় মুসলমানদেরও বটে । একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে ।
মহানবী (সঃ) একবার বলেন যে,
‘তোমরা আমার কোন কথাই লিখো না । কোরআন ব্যতিত আমার নিকট থেকে কেউ অন্যকিছু লিখে থাকলে তা যেন মুছে ফেলে’ (সহীহ মুসলিম) ।
মহানবী (সঃ) এঁর এই কথা বলার কারণ এই ছিল যে, তখন লেখা সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা ছিল না । কিন্তু কোরআনকে অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষণ করা জরুরী ছিল । এ কারণে যে কোন সূরা নাযিল হওয়ার সাথে সাথে নবী করিম (সঃ) নিজে মুখস্থ করতেন এবং সাহাবীদেরকেও তা মুখস্থ রাখতে বলতেন । নবীর অন্য কোন কথা মনে রাখতে হলে কোরআন অবিকৃত রাখা কঠিন হতে পারে । মূলত একারনেই নবী তাঁর নিজের কথা লিখতে নিষেধ করেন । হযরত ওসমান (রাঃ) যখন কোরআন পবিত্র গ্রন্থ আকারে সংকলন শেষ করেন – এই হাদিসের মেয়াদকাল তখনই শেষ হবার কথা । কিন্তু নবী করিম (সঃ) এঁর মৃত্যুর পর প্রায় একশ’ বছর পার হলেও এই হাদিসের কারণে কেউ নবীর কথা লিখেন নি । তাঁরা নবীর বিষয়ে লেখা ইসলামী বিধানের পরিপন্থী মনে করেছেন ।
ইসলামের ৫ম খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ক্ষমতায় আশার পর পরই কয়েকজন প্রবীণ সাহাবীর মৃত্যু হয় । তখন খলিফা নিম্নরূপ একটি ফরমান জারি করেনঃ
‘আমি শংকিত যে, আলেমগণের তিরোধানের মাধ্যমে এলেমের বিলুপ্তি ঘটছে । অতএব, তোমরা রাসুলের বাণীর দিকে লক্ষ্য কর, বা জমা কর এবং লিখে ফেলো’ ।
তিনি এই ফরমান সকল গভর্নরের কাছে প্রেরণ করেন । যার পরিপ্রেক্ষিতে হাদিস সংগ্রহের কাজ শুরু হয় । খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তৎকালীন আলেমগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই হাদিস সংগ্রহের এই ফরমান জারি করেন । সেদিন খলিফা আলেমগণের কথা শুনলে আজকে যে ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ বর্তমানে প্রচলিত আছে; তাও থাকতো না ।
মুসলিম আলেমগণের একটি বড় অংশ মনে করেন যে, পবিত্র কোরআন আর হাদিসে যা বলা হয়েছে, তার বাইরে আর কিছু নেই । যুগের পরিবর্তনের সাথে নতুন কোন ব্যাখ্যার সুযোগ নেই । কিন্তু এটা ঠিক নয় । পবিত্র কোরআনের ‘সূরা আসর’ এ মহান আল্লাহ ‘সময়ের শপথ’ দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিতে নিমজ্জিত’। এ কথার অর্থ আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূল ভালো জানেন । কিন্তু আমার সীমিত জ্ঞানে মনে হয়েছে, কোন কিছু ব্যাখ্যাকালে যে সকল মানুষ সময় বিবেচনা করে না, তারাই ক্ষতিতে নিমজ্জিত হয় । যেমন মহানবী (সঃ)কে নিয়ে লেখা বিষয়ের হাদিসটি বর্ণনাকালে কখন ও কেন এইরুপ কথা বলা হয়েছে, তা বিচার বিশ্লেষণ না করার কারণে, হাদিস সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিতে মুসলমানদের প্রায় একশ’ বছর সময় লেগেছে । এতে নিঃসন্দেহে মুসলমানদের অনেক বড় ক্ষতি হয়েছে ।
ভারতের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য । সকলের জানা, ইংল্যান্ডের ইষ্ট ইনডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাবকে পরাজিত করে ভারতে কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠা করে। কোম্পানির কাজ মুনাফা করা । জনগণের কল্যাণ করা কোম্পানির কাজ নয় । সংগত কারণেই কোম্পানির শাসন আমলে তাদের অত্যাচারে এ উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে । এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে । ইংরেজ কঠোর হস্তে সিপাহী বিদ্রোহ দমন করে । এই বিদ্রোহের জন্য মুসলমানদের দায়ী করা হয় । স্যার সৈয়দ আহমেদ খান ইংরেজ ভক্ত ছিলেন । সিপাহী বিদ্রোহ শেষ হওয়া পর্যন্তও তিনি ইংরেজ ভক্ত ছিলেন । কিন্তু এই বিদ্রোহের কারণ হিসাবে যখন মুসলমানদের দায়ী করা হয়, তখন তিনি কলম ধরেন । লিখে ফেলেন, ‘The causes of Indian mutiny’ । তিনি তাঁর লেখায় সিপাহী বিদ্রোহের জন্য ইষ্ট ইনডিয়া কোম্পানিকে দায়ী করেন এবং সেই প্রতিবেদন ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেন । মুসলমানদের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেই কাজটি করেন তিনি । এই মুসলিম জাতীয়তাবাদের জনক হিসাবে খ্যাত স্যার সৈয়দ আহমেদ খান যখন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা নেন, মুসলিম আলেমগন তখন তাঁকে ‘কাফির’ আখ্যা দেন এবং তাঁর ধর্মচ্যুতি ঘটেছে বলে ফতোয়া দেন ।
১৮৫৭ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান হয় । ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়া ব্রিটিশ ভারতের শাসনভার গ্রহন করেন । তখন ব্রিটিশ ভারতের বড়লাট ছিলেন লর্ড ক্যানিং । তিনি ‘Act of Incorporation’ এর আওতায় কোলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজে ৩ টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আদেশ দেন । তখন এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মত একজন মুসলিম ছাত্রও পাওয়া যায়নি । ভারতের মুসলিম আলেমগণের আধুনিক শিক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া – এর মূল কারণ ।
(চলবে)
২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ । ইস্কাটন, ঢাকা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*