মহান বিজয় দিবসের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত ভাষণ

ডা. এস. এ মালেক
বিশিষ্ট কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক, 
৪৯ তম মহান বিজয় দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনার ভাষণ জনগণকে নতুন করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনে যে নতুন প্রেরণা যোগাবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তিনি এই ভাষণ এমন এক সময় দিলেন, যখন স্বাধীনতা বিরোধী, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠবার চেষ্টা করছে। বিজয় দিবসের আনন্দ- উল্লাসকে ম্লান করার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করার মাধ্যমে নতুন করে একটা নন ইস্যুকে ধর্মীয় ইস্যুতে রূপান্তরিত করে অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্য তাঁর প্রদত্ত ভাষণে স্পস্টতঃ বলে দিয়েছেন যে, স্বাধীন বাংলাদেশে কোন বিশেষ সম্প্রদায় একমাত্র বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার দেশ নয়। এটা হচ্ছে-এমন এক স্বাধীনদেশ যেখানে ৪টি বৃহত্তম সম্প্রদায় মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীষ্টান এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী স্ব-স্ব সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনাভিত্তিক বাংলাদেশের সৃষ্টি; সেখানে সাম্প্রদায়িক হওয়ার কোন সুযোগ নেই। নেই ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার অধিকার। অবশ্য প্রত্যেক ধর্মাবলম্বী তার ধর্ম অনুযায়ী জীবন বিধান পরিচালনা করবেন কিন্তু অন্য ধর্মের উপর হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না। রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতি কোন ধর্মীয় বিধি-নিষেধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে না। এক্ষেত্রে আমাদের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ধর্মনিরপেক্ষতার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ঐ ব্যাখ্যা সকলের জন্য অনুস্মরণীয় ও অনুকরণীয়। তিনি স্পষ্টতঃ ভাষায় বলেছেন, ধর্ম নিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। প্রত্যেক ধর্মের মানুষ তার ধর্মীয় মতাদর্শ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সমাজে বসবাস করবে। কেউ তাতে বাধা দিবে না। এমনকি রাষ্ট্রও নয়। বঙ্গবন্ধু বলেন, “রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টিকরে, তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট। যে মানুষকে ভালোবাসে সে কোনদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না”। তিনি আরো বলেন, ইসলামই প্রথম ধর্ম নিরপেক্ষতার বাণী বিশ্বে প্রচার করেছে, তোমার ধর্ম তোমার জন্য , আমার ধর্ম আমার জন্য এবং ধর্মে কোন জুলুম বা অত্যাচার নেই। এ কথা পবিত্র কুরআনে ছাড়া আর কোনো ধর্মগ্রন্থ প্রচার করেনি। ধর্মকে বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধা করতেন”।
আসলে বিজয় দিবসে প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তবে বর্তমানে মুর্হুতে জাতিকে যে দিক নির্দেশনা দিলেন, তা প্রণিধানযোগ্য। আমরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলতে বুঝি- মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের ভাষা, সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের বিশেষ মতাদর্শ ভিত্তিক নয়। সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব জনগণের অধিকার সংরক্ষণ। রাষ্ট্রের নাগরিক তিনি যে ধর্মাবলম্বী বা মতাদর্শে বিশ্বাসী হন না কেন, তার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে, তা উপভোগ করার, রাষ্ট্র এ ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করবে না। তাই তিনি আমাদের পবিত্র সংবিধানে রাষ্ট্র কাঠামো কি হবে তা সন্নিবেশিত করেন। বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি কোন বিশেষ ধর্মীয় ভিত্তিক হবেনা। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে-জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা”- এই নীতির উপরে বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। আন্তঃ সাম্প্রদায়িক, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, কলহ-বিবাদ নিরসনের এটাই সর্বৎকৃষ্ট নীতি। আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে মুসলামান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানদের ভাষা ও সাংস্কৃতিতে। এমনকি ধর্মীয় সংস্কৃতি, আচার আচরণ, খাদ্যাভাস, পোষক-আশাক ও বাঙালি বলতে এক সম্বন্বিত জাতি বুঝায়। সাম্প্রদায়িকতা ভিত্তিক সমাজ বিনির্মণে এখানে কোন সুযোগ নেই। এই উপ-মহাদেশে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার কারণে যে ভাবে মানবতা নিগৃহিত হয়েছে, সেই বৃট্রিশ আমল থেকে, বিশেষ করে ভারত বিভাগের প্রক্রিয়া যখন কার্যকর হয়; তা মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমরা দেখেছি ১৯৪৭ সালে বৃট্রিশ সরকার কর্তৃক ভারত বিভক্ত হওয়ার পর হিন্দুদের জন্য হিন্দুস্তান (ভারত) আর মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান। এই দুটি পৃথক উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই উভয় রাষ্ট্রে চরমভাবে নিগৃহীত হয়েছেন। শত-সহ¯্র লোককে জীবন দিতে হয়েছে। এধরণের সংকট নিরসনেই বাংলাদেশের সৃষ্টি। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবদ ও ধর্মরাষ্ট্র পাকিস্তান হতে স্বাধীন সার্বভৌম, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের সৃষ্টি। কিন্তু সেই বাংলাদেশ যা প্রায় ৫০ বছর পূর্বে স্বাধীন হয়েছে, সেখানে এখনো সাম্প্রাদায়িক শক্তি মাথাচারা দিয়ে উঠবার চেষ্টা করছে। শুধু আছে না, সক্রিয় আছে।
তাই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর আঘাত কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুযোগ পেলেই সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন, জোরপূর্বক তাদের সম্পত্তি দখল, ধর্মীয় উপাসনালয়ে আঘাত, এই ৫০ বছরে অব্যাহত আছে। এটা ধর্মনিরপেক্ষ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত বাস্তবতা। অপর দিকে ভারতেও বিশেষ করে আসামে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা লেগেই আছে। আর পাকিস্তানের কথা না বলাই ভালো। কোননা সেখানে এখনও ধর্ম ও রাজনীতি সংমিশ্রিত। বাংলাদেশে বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলমান; তাই স্বভাবতঃই বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলমান হওয়ায় মুসলীম সংস্কৃতির একটা প্রভাব সমাজে রয়েছে। যার সাথে জাতীয় সংস্কৃতির কোন সংঘাত বাঞ্ছনীয় নয়।  আমরা মুসলমান, নামাজ পড়ি, রোজা রাখি। শুক্রবারে মসজিদে প্রার্থনা করি। ঈদ উদযাপন করি। এর কোথাও অন্য ধর্মের প্রতি বিরূপ মনোভাবেবর সুযোগ নেই। একইভাবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খিষ্ট্রান তাদের স্ব-স্ব ধর্মানুযায়ী সমাজে জীবন যাপন করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, বাঙালি হিসেবে এই সম্প্রদায়ভূক্ত শান্তি ও সহযোগিতামূলক একটা সেক্যুলার বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের মননীয় প্রধানমন্ত্রী একজন খাঁটি মুসলমান। তিনি নিয়মিত নামাজ, রোজা, যাকাত, কুরআন তেলওয়াৎ করে এবং সরকার প্রধান হিসেবে অন্য ধর্মের প্রতিও উদার ও সহানুভূতিশীল। তার পরেও এদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও তাদের সংগঠন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ধার্মিকতাকে কিছুটা হলেও সাম্প্রদায়িকতার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে মসজিদ, মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষায় লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে বেকারত্বের দিকে এগুচ্ছে এবং জাতীয় জীবনে সহাসংকট সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে- এই অবস্থা থেকে তিনি ইসলামিক মূল্যবোধ ও গুরুত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন।  এর পরেও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ইসলামি দলগুলো থেকে আনা হয়। যা সত্যিই দুর্র্ভাগ্যজনক। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় আজকে যারা ধর্ম দিয়ে রাজনীতি করেন, জঙ্গীবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাদেরকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকের বসবাস। ধর্ম-আলাদা হলেও আমাদের সবার-আর একটাই পরিচয় আমরা বাঙালি। কথাটি এখনো প্রাসঙ্গিক। প্রধানমন্ত্রী তাঁর পিতার আদর্শ ও মূল্যবোধ সম্বন্বিত রেখে দেশ পরিচালনা করছেন।

তাই জাতির উদ্দেশ্য সাম্প্রতিক ভাষণে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টতঃ জানিয়ে দিয়েছেন, এখানে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান নেই।  মৌলবাদী ও জঙ্গীবাদের কোন সম্প্রসারণ হতে দেওয়া হবেনা। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটা স্বাধীন বাঙালি বস্তুতঃ তার শাসনামলে অসাম্প্রদায়িকতার সংরক্ষিত, সাম্প্রদায়িকতা জনিত দুর্ঘটনার যে কঠোর হস্তে তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তার দৃষ্টান্ত এই উপমহাদেশে নাই। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এ্রতদ্বঅঞ্চলের যেকোন সরকারের চাইতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টতঃ জানিয়ে দিয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতাকে কোন অবস্থাতেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবেনা। অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। ‘৭৫এর প্রতিবিপ্লবের কারণে তা প্রায় দীর্ঘ ২১ বৎসর পরিবর্জিত ও পরিত্যাজ্য ছিল। শেখ হাসিনার শাসনামলে তা আমার পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। এখনো অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে। এব্যাপারে জনগণকে তিনি হুসিয়ার করে দিয়েছেন। বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গীবাদের কোন স্থান নেই। ধর্ম আছে তবে ধর্মের নামে অধর্মের অপচর্চ্চা করতে দেওয়া যাবে না। তাই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ অত্যন্ত সময়োচিত, দায়িত্বশীল ও যাথার্থ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*