মহান বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা

ডা. এস এ মালেক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক, 

বিজয় শব্দটা হৃদয়গ্রাহী। এটা কোন ব্যক্তির বিজয় নয়। সাড়ে সাত কোটি নির্যাতিত, নিপীড়িত, মুক্তিকামী বাঙালির বিজয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে বিজয় আমরা অর্জন করেছি, এরূপ বিজয় বাঙালি এর আগে কখনো উপভোগ করেনি। এদতঅঞ্চলের মানুষ প্রায় বিজয়ের কাছা কাছি হয়েছে অনেক বার। কিন্তু জাতিসত্তাকে জাতিরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করবার বিজয় এর আগে সম্ভব হয়নি। আর যে মহান নেতা এবিজয়কে স্বার্থক করেছেন, তিনি হচ্ছেন-বাঙালি ও বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখন নিশ্চিত বলা যায়, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে কোনদিন বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না। তাই ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের বীজ রোপিত হয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি বাঙালি জাতিসত্তায় নিজেকে বিলীন করেছেন। তাঁর পরিচয় ছিল-তিনি বাঙালি। বাংলা তাঁর মায়ের ভাষা। বাংলাদেশ তাঁর জীবন গাঁথা। এদেশের মানুষের জন্য যে কোন প্রকার ত্যাগ শিকারে তিনি ছিলেন সর্বদা প্রস্তুত। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি দেখেছেন বৃট্রিশ আমলের নির্মম শাসন ও অত্যচার। আর পাকিস্তান আমলের শোষণ, শাসন ও নির্যাতন। ছোট বেলা থেকেই তাই তাঁর বিদ্রোহী মন, জনগণের দুঃখে-কষ্টে সর্বদা বিচলিত হয়েছে। তিনি তাঁর দেশের মানুষকে ভালবাসতে শিখেছেন। যিনি তাঁর সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁর কথা শুনেছেন, তাঁর কাজকর্ম নীবিড়ভবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তিনি এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছেন যে, বাকি জীবন তাঁর হৃদয় জুড়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি দখল করে রেখেছে। তিনি ছিলেন বাঙালির ভালোবাসার কাঙ্গাল। তিনি বলেছিলেন, আমার গুণ হচ্ছে আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসি।“ আর আমার বড় দোষ হচ্ছে-তাদের বেশি ভালোবাসি”। এ কথার তাৎপর্য বোধহয় এই ভালোবাসার কোন দোষ নেই। কিন্তু বেশি ভালোবাসা অনেক সময় দোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই করোনার মহামারীর মহাদুর্যোগে বাংলাদেশে আমার যারা লকডাউনে ঘরে আটকা আছি, আটকা আছি বললে ভুল হবে। কেননা আমরা পারস্পারিক সম্পর্ক ঘরের ভিতরে ও বাহিরে অব্যাহত রেখেছি। এর পরও করোনা জনিত বিধি নিষেধের কারণে কত মানুষ যে, মানষিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে; তা চিকিৎসকরা টের পাচ্ছে। এক বার ভেবে দেখুনতো বঙ্গবন্ধুর জীবন কাহিনী। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবন কেটেছে কারাগারে। পরিবারের সদস্য- প্রিয়তমা স্ত্রী, বাবা মা, ভাই বোন, ছেলে মেয়ে, ও নিকট আত্মীয় স্বজন এবং রাজনৈতিক কর্মীদের থেকে বিচ্ছিন্ন। কখনো নির্জন কারাগারে একাকী, খবরের কাগজ দেওয়া বন্ধ, কারার অন্ধ প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ। অত্যন্ত নি¤œ মানের খাবার পরিবশেন, কঠোর জীবন যাত্রা। মোনায়েম খানের হুমকি শেখ মুজিবকে দিনের সূর্যের আলো দেখতে দেওয়া হবে না। এর পরেও পরিবারের কোন সদস্য যখন তাঁর সাথে জেলে দেখা করতে গেছেন, সদা হাস্যজ্জ¦ল মুখ। সধারণভাবে কথা বলা। কি করে সম্ভব হয়েছে, ভাবতেও তা অবাক লাগে। সম্ভব হয়েছে এ কারণে জনগণের কারণে। তিনি নিজেকে সর্পে দিয়েছেলেন, যে কোন প্রকার কষ্ট এমনকি মৃত্যু বরণ তাঁর জন্য ছিল স¦াভাবিক। তাই বার বার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও বাঙালির জয় গান গেয়েছেন। এক বর ভেবে দেখেন তো পাকিস্তানের কারাগারে আবদ্ধ বঙ্গবন্ধু। পাশে কবর খোড়া। ততাকতিথ ক্যামেরা ট্যায়াল চলছে। রাষ্ট্র দ্রোহিতার মামলায় মৃত্যু অবধারিত। বিন্দু মাত্র বিচলিত বোধ নাই।  তিনি বললেন, “আমাকে ফাঁসি দাও আমি কখনো ভীত নয়। তবে আমার শেষ ইচ্ছা-আমার লাশটা বাঙালার মাটিতে পৌঁছে দিবে। ”  আগরতলা ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা চলা কালেও ক্যামেরা ট্যায়াল চলাকলে বঙ্গবন্ধুকে বিচলিত হতে দেখা যায়নি। আগার তালা মামলায় তাঁকে যখন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন এক মুঠো মাটি নিয়ে তিনি কপালে স্পর্শ করেন। মাটির ও মানুষকে কতটুকু ভালবাসলে এটা করা যায়, তার একমাত্র উদহরণ শেখ মুজিব। শোষিত, বঞ্চিত মানুষের তিনি জীবনকে উৎসর্গ করেছেলেন। যা তাঁর ভয়-ভীতি বলতে কিছুই ছিল না। জীবনের প্রতি মূর্হুতে তাকে লড়াই সংগ্রম করেই কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়েছে। আমি একথা বলবো না যে, শিক্ষা-দীক্ষা বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জনে তিনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে প্রমাণ করেছেন। তবে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এদেশের যে কোন কৃতি সন্তানের চাইতে তাঁর অবস্থান অনেক উপরে। এদেশের সমসাময়িক রাজনীতিবিদ যখইনি গভীর সমস্যার সন্মুখীন হয়েছেন, পিছু হঠেছেন, তখন শেখ মুজিবের নেতৃত্ব সঠিক পথ দেখিয়েছে। ঐতিহাসিব ৬দফা দাবি পেশ করার পর যখন আইয়ুব খানের রক্ত চক্ষু তাঁর উপর নিমজ্জিত, তাকে পাকিস্তানের এক নম্বর শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; তখন তাঁর দলের অনেক নেতায় কেটে পরেছেন, মুসলিম লীগের ভাষায় শেখ সাহেবের সমালোচনা করছেন; শ্রদ্ধেয় মওলানা ভাসানীর মতো নেতাও প্রধনে ৬ দফাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাঁর বিশ্বাসে অটল। ৬ দফার প্রতি ছিল তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়। ৬ দফাকে জয় যুক্ত করেই যে তিনি বঙালিকেহ অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছে দিবেন সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত চিলেন। ‘৭০ এর ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনে ৬ দফাকে নির্বাচনের ম্যানডেট হিসেবে ব্যবহার করে তিনি বিশ্ববাসিকে বুঝিয়ে দিলেন, তিনি যা বলেছেন, তাই ঠিক। ৬ দফা বাস্তবায়ন করেই তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তাই প্রধানমন্ত্রীত্বের বিনিময়েও তিনি ৬ দফার  প্রশ্নে ছিলেন অপোসহীন। ৬ দফা যে শুধু স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি তা নয়। তিনি একে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত করে দেশ কে স্বাধীন করেছেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বঙ্গবন্ধুর স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেনি। স্বাধীনতার শত্রুরা মাত্র সাড়ে নিত বছরের মাথায় তাঁকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছেন। ‘৭৫ থেকে ‘৯৬ এই একুশ বছর শুধু বাংলাদেশ জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকায় স্বাধীন ছিল। মহান স্বাধীনতার মাধ্যমে যা কিছু অর্জিত হয়েছিল; তা এই দীর্ঘ সময়ে ক্রমাগত বিসর্জিত হয়েছে। ৩০ লক্ষ শহিদের রক্তের বিনিময়ে ও লক্ষ লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যে দেশটি স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম  পরিহাস বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে জাতির কপালে নেমে আসে দুঃখের অমানিশা।

যদি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হাল না ধরতেন, দলকে বার বার ক্ষমতাশীন না করতেন, মৌলবাদী শক্তি ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৫ বছর লড়াই সংগ্রাম করে বিজয়ী না হতেন, তা হলে এত দিনে বাংলাদেশ একটা পূর্ণ সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হতো। ‘৭১ এর মহান স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াতো। তাই বাংলাদেশের জন্মদাতা বঙ্গবন্ধু ও ত্রাণকর্তা হচ্ছেন-বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট যে দুঃখজনক ইতিহাস এদেশে সৃষ্টি হয়েছিল মহান আল্লাহ শেখ হাসিনাকে স্বয়ং রক্ষা করেছিলেন বলেই, তিনি আজ জানে বেঁচে আছেন। আর বেঁচে আছেন বলেই তিনি ৪র্থ বারের মত রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে তাঁর পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে দূর্বার গতিতে সামানের দিকে এগিয়ে চলেছেন। দেশ আজ উন্নয়নের মহা সড়কে। বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। একবার তুলনা করে দেখুনতো (১৯৭৫-১৯৯৬) এই সুদীর্ঘ ২১ বছর জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ ও বেগম খালেদাজিয়ার শাসন আমলে বাংলাদেশ ও আজকের বাংলাদেশের উন্নয়নের পার্থক্য সহজেই ধরা পড়ে।  এই লেখা যখন লিখছি অর্থাৎ ১১ ডিসেম্বর, তখন পদ্মাসেতুর সর্বশেষ ৪১ তম স্পান বসানো হচ্ছে ও পুরো সেতু ৬.১৫ কি.মি দৃশ্যমান হচ্ছে। এ এক মহাগৌরবের ও মহা উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ। আমরা অতিতে দেখেছি পদ্মাসেতু নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র ও বাধা এসেছে। বিশ্ব ব্যাংক যখন পদ্মাসেতুর অর্থায়ন থেকে সড়ে দাঁড়ায় তখন এই স্বপ্নের পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়ে। আমাদের মহান নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিচলিত না হয়ে বিশ্ব ব্যাংকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মানের পরিকল্পনা নেন। আজ বিশ্বকে তাকলাগিয়ে স্বপ্নের পদ্মসেতু আজ রুপকল্প নয়, সত্যিই বাস্তবতা। আগামী এক দেড় বছরের মধ্যে এই সেতু জনগণের জন্য যাতাযাতের সুযোগ সৃষ্টি হলে দেশের অর্থনীতির চেহারাটাই সম্পূর্ণ রূপে পাল্টে যাবে।  উন্নয়নের নবনব দিগন্তের সৃষ্টি হবে। করোনা মহামারী মোকাবেলায় শেখ হাসিনা দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রশংসার দাবী রাখে। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে শেখ হাসিনার সফলতা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। আর অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তার দূরদর্শী ও বিচক্ষণ পরিকল্পনা জাদুর ম্যাজিক হিসেবে পথ দেখিয়েছে। বিশ্বমন্দা ও বিশ্ব অর্থনীতির যে মরণ ছোবল সবকিছু গ্রাস করতে যাচ্ছিল-শেখ হাসিনা সেই বিপর্যস্ত অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চার করে উন্নয়নের ধার অব্যাহত রেখেছেন। দেশে দুর্ভিক্ষ বা প্রাণ হানির যে সংখ্যা আশংকা বিশ্ববাসী ধারণা করে  ছিল, তা আর মিথ্যাচারে পরিণত হয়েছে। অবশ্যই শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কিত বুদ্ধিমত্তার ফসল।

জাতি যখন স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির দ্বার প্রান্তে, সেই সময় আবার স্বাধীনতার চিরশত্রু, পরাজিত শক্তি ও মৌলবাদী শক্তির আস্ফালন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপর যে আঘাত হানছে, তাদের সেই ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম মুক্তিযুদ্ধের চেতানার স্বপক্ষের সকল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করতে হবে। বিজয়ের এই মহান মাসে এই হোক আমাদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। মৌলবাদের বিষ দাঁত সমূলে নির্মূল করার এখনি উপযুক্ত সময়। দেশ বাসীকে মহান বিজয়ের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আর জননেত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাই এই করণে যে, তিনি আমাদের কা-ারী হিসাবে এখনো পথ দেখাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*