ভাস্কর্য, মূর্তিপূজা ও বাস্তবতা।

ডা. এস এ মালেক
বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনৈতিক

আবার রাজপথে মৌলবাদীদের হামলা। এবার প্রসঙ্গ ভাস্কর্য। জাতির পিতার ভাস্কর্য বিনির্মাণে তাদের আপত্তি। তাদের বক্তব্য, ইসলামিক রীতিনীতির সাথে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা বোধহয় বলতে চায়, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য মানে বঙ্গবন্ধুকে পূজা করা। মূর্তি পূজা বা মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন হিন্দু-বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সর্বধর্মেই আছে। একসময় আলেম-ওলামাদের মৃত্যুজনিত কারণে তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের ভাস্কর্য নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করানো হতো। মূর্তিপূজা আর ভাস্কর্য একই জিনিস নয়। এটা বোঝাবার মতো জ্ঞান মৌলবাদীদের আছে। সত্যতার নিদর্শন হচ্ছে শিল্প-সংস্কৃতি। পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন দেশে যেসব কৃষ্টি, সভ্যতা গড়ে উঠেছিল; তা কয়েক হাজার বছর পর আবি¯ৃ‹ত হওয়ায় মানুষ জানতে পেরেছে মানুষের জীবন-যাত্রা প্রাণালী কি ছিল। প্রগতির ধারায় তা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানেই বা কি রুপ নিয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতি সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষ্য। এজন্যই সভ্য মানুষ তাদের সংস্কৃতির চেতনা দিয়ে যুগের পর যুগ অস্তিত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে। মিশরে সাড়ে তিন হাজার বছর প্রায় আগে কি করে মমি হিসেবে কোবে রাখা হয়েছে, তা সাম্প্রতিক আর্বিস্কৃত হয়েছে। আমরা সিন্ধু সভ্যতার কথা জানি। এইরুপ নীল সভ্যতা, ইউফেœটিস সভ্যতা, গ্রীস সভ্যতা, যখন চরম বিকাশমান, তখন প্রত্যেকটি সভ্যতার সম্পূরক হিসেবে শিল্প ও সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের বাংলাদশে প্রতœতত্ত্ববিদরা মাটি খুঁড়ে বিভিন্ন যুগের সভ্যতার নিদর্শন আবিস্কার করে। সে গুলো মানুষকে অবহিত করেছেন। সমাজ, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, আহার-বিহার সব অবগত হচ্ছেন।

শেখ মুজিব বাংলার ইতিহাসের এমন এক নেতা; যার মতো নেতৃত্বের আবির্ভাব বাংলাদেশে কয়েক হাজার বছরেও ঘটে নি। আর আগামীতে ঘটবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। বাঙালি জাতিয়তাবাদী চেতনাকে জাতিসত্তায় রুপান্তরিত করে জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব তাঁরই। তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাংলার মানুষ যতদিন স্বাধীনতা ও সর্বোভৌমত্ব ভোগ করবে, ততদিন তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। এই মহান নেতার জীবনকাল ছিল মাত্র ৫৫ বছর। তাঁর এই স্বপ্ল জীবনে তিনি তাঁর দেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে চিরদিনের জন্য স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। আর এই দেশ তিনি স্বাধীন করেছিলেন বলেই, আমরা জাতি হিসেবে গর্বিত। দেশ স্বাধীন করলেও দেশ শাসন করবার সুযোগ বেশি দিন পাননি। যে লক্ষ্য সামনে রেখে তিনি দেশ স্বাধীন করেছিলেন, অর্থাৎ সর্বপ্রকার শোষণ-মুক্ত একটি সমাজ; তা তিনি করে যেতে পারেননি। তাঁর সুযোগ্য কন্যা দেশ রতœ শেখ হাসিনা তার কাজ বাস্তবায়নে দ্রুত এগিয়ে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হত ১০০ বছর। অথাৎ তার মৃত্যুার পর ৪৫ বছর কেটে গেছে। দেশ কিন্তু থেমে নেই। কখনো উন্নয়ন, কখনো অবনতির কবলে পড়তে হয়েছে দেশকে।

স্বাধীনতা বিরোধীরা যখন ক্ষমতায় আসে, তখনই বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। আর এই স্বাধীনতা বিরোধীরাই রাজপথে বিরোধীতায় বিএনপির প্রাণশক্তি। কখনো প্রকাশ্য, কখনো গোপনে, পরস্পর সহযোগিতা করছেন। তাদের লক্ষ্য স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করিয়ে ২১ বছর তাদের স্বাধীনতা বিরোধী চিন্তা-চেতনা দিয়ে দেশ পরিচালনা করেছেন। ফলে দেশ ক্রমগত অধগতির দিকে ধাবিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্থলে তার বিকল্প হিসেবে তাঁরই স্থানে তারই সুযোগ্য কন্যা তার মতাদর্শনুযায়ী দেশ পরিচালনা করে শুধু ভয়াবহ দুর্যোগের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করেন নি; উন্নয়ন ও অগ্রগতির পেছনে অগ্রসরমান করেছেন। এখন  যদি এদেশের জনগণ বঙ্গবন্ধুকে জনগণের হৃদয়ে গভীর ভাবে প্রথিত করবার বাসনে তাঁর শারীরিক অবয়বকে ভাস্কর্য়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় উপস্থাপন করে এবং জনগণের কাছে সার্বক্ষনিকভাবে তা দৃশ্যমান হয়; তাহলে , তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্মরণ ও শ্রদ্ধায় অবনত মস্তকে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। এটা তো কোন পূজা নয়। কারও উপাসনা নয়। এটা একটি মহান জনগোষ্টির মহান নেতার প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন শিল্পের মাধ্যমে মনে গেঁথে দেওয়ার একটা বিষয়। যুুগে যুগে সভ্য জাতি এটা করে আসছে। এর সাথে ধর্মের কোন বিরোধ থাকতে পারে না। ইসলামে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ। কারণ অন্যান্য ধর্মে যেমন প্রতিষ্ঠিত দেবতাদের মন্দিরে, গির্জায় পূজা করা হয়।

একত্ববাদ ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহর কোন বিকল্প না থাকায় ঐধরণের পূজা পার্বন নিষিদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য মানে বঙ্গবন্ধুর অসমান্য অবদানের কথা স্মরণ। স্মরণ তার অসামান্য কৃতিত্ব। জাতির পিতার মযার্দায় তাকে মহান আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তা দেশের জনগণ যদি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার কারণে তার প্রতিকৃতি ভাস্কর্যের মাধ্যমে দৃশ্যমান করেন, তাহলে ইসলামের একত্ববাদ কোন প্রকারে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে না। আমরা যখন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি; তখন আমাদের স্মরণে থাকে বঙ্গবন্ধু সমান নেতৃত্বের গুণাবলি, জনগণের প্রতি তার সীমাহীন ভালবাসা, জনগণের জন্য জীবন উৎসর্গ করার আকাঙ্খা। সব নিয়েই শেখ মুজিব, আর তাঁর ভাস্কর্য হচ্ছে এইসব গুনাবলির প্রতিক। এটা ব্যক্তি মুজিবকে পূজা করার কোন ব্যাপার নয়। সংস্কৃতির মাধ্যমে আমরা আমাদের চিরঞ্জীব করে তুলি । মানুষ হচ্ছে-এমন এক সচেতন প্রাণী যে, যারা তাদের কর্মকান্ডকে যুগের পর যুগ টিকিয়ে রেখে ইতিহাসে অবস্থান করে নিতে চায়। স্বভাবতঃ শিল্প-সংস্কৃতি হচ্ছে এর মাধ্যম। ভাস্কর্য জ্ঞান বোধের এখান থেকেই উৎপত্তি। এর সাথে ব্যক্তিত্বের কোন সম্পর্ক নেই। যারা ধর্মীয় কারণে ভাস্কর্য টেনে নামাতে চান; তাদের মতলব ভিন্ন, একবারেই রাজনৈতিক। দেশে সরকার বিরোধী কোন আর্থ-সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ বিরোধীদল, ষড়যন্ত্রের পথ ধরে জনগণকে ধোকা দিয়ে চলমান অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে চায়। সরকােেরর জন্য সংকট সৃষ্টি তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করে তারা ভেবেছিল, দেশ ও জাতিকে তারা আবার করায়ত্বকরতে পারবে। কিন্তু শেখ হাসিনার কারণে তা সম্ভব হয়নি। আজ রাষ্ট্র, প্রশাসন, সরকার,  জনতা শেখ হাসিনার পেছনে ঐক্যবদ্ধভাবে আছে। আজকে আন্দোলনের বিষয় বস্তু অনাহার, দারিদ্র, স্বাস্থ্যসেবার, বঞ্চনা, আশ্রয়হীনতা, শিক্ষার সুযোগের অভাব নয়। বস্তুহচ্ছে-এখন একটা নন ইস্যুকে ইস্যু করা। যার কোন আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদে যারা বিশ্বাসী, তারা এভাবে সহজ-সরল জনগোষ্টিকে আঘাত করে তাদের সরকার বিরোধী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে চায়। পাকিস্তান আমলে আমরা দেখেছি, তারা বাংলা ভাষার আন্দোলনকে ভারতীয় চক্রান্ত বলে প্রমাণ করতে চেয়েছিল। ‘৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভোট না দিলে বিবি তালাক হবে; এরুপ ফতোয়া তারা দিয়েছিল। তবে একটা সত্য কথা বলেছিল ৬ দফাকে ওদের দৃষ্টিতে ওটা ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার দফা। আর ওটাই ছিল বাস্তবতা। এছাড়া আজ পর্যন্ত স্বাধীনতা বিরোধীরা যাই করুক না কেন তাদের লক্ষ্য হচ্ছে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। জনগণের কাছে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন করা ও জঙ্গীবাদ মাধ্যমে সরকারকে হঠিয়ে দেওয়া। ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে তাদের ষড়যন্ত্রমূল এতই স্পষ্ট যে, আল্লাহ আকবার বলে হিন্দুর মেয়েকে ধর্ষণ ও ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দিতে গেলে মানুষ স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন তুলে আসলে ব্যাপারটা কি? ভাস্কর্যের ব্যাপারটাও একইরুপ। জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার উপায় না পেয়ে তাদের দৃষ্টি এখন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের দিকে।

এদেশে তো অনেক ভাস্কর্য অনেক পূর্বেই তৈরী হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তো কোন অবস্থান নেননি। তাহলে বঙ্গবন্ধুর ভাস্বর্যে এত প্রতিবাদ কেন? বঙ্গবন্ধু; শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তিকে পাকিস্তান ভাঙ্গার অপরাধে ধর্মবিরোধীবলে পাকিস্তান ভাঙ্গার বেদনায় তারা এতই ক্ষুদ্ধ যে সুযোগ পেলেই তাদের বিরুদ্ধে নেমে পড়ে। ষড়যন্ত্র শুরু করে রাজপথে সহিংস আন্দোলন করে। লক্ষ্য সরকার পতনের। ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করবার নয়। ওরা জানে, ভাস্কর্য, মূতি পূজা নয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরোধীতার মূললক্ষ্য স্বাধীনাতার-সার্বভৌমের বিরোধীতা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরোধীতা। জাতীয় সংগীত ও পতাকার বিরোধীতা, জাতিকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলা। আর একারণেই বঙ্গবন্ধুর জীবনদ্দশায় ও মৃত্যুর পরে তার অবমূল্যায়ণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বাঙালির অবিনাশী চেতনার মূর্ত প্রতীক। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য চির ভাস্কর হয়ে থাকবে। এবিষয় নিয়ে অনাকাঙ্খিত বিতর্ক সৃষ্টি কারীদের অসৎ উদ্দেশ্য আছে। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে এদেশের স্বাধীনতাকামী কোটি কোটি মানুষ তাদের প্রতিহত করবে। আইনও তার নিজস্ব গতিতে চলবে। প্রতিমা/মূর্তির সাথে সম্পর্ক রয়েছে পারলৌকিকতার সম্পর্ক। আর ভাস্কর্যের সঙ্গে রয়েছে ইহজাগতিকতার। তার মানে এই নয় যে, প্রতিমা নাজায়েজ আর ভাস্কর্য জায়েজ। আমি মনেকরি, এখানে তুলনা গ্রাহ্য নয়। তাই এখন সময় এসেছে, স্বাধীনতার শত্রুদের চিরতরে নির্মূল করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*