যে কারণে শেখ হাসিনা সুদীর্ঘকাল ক্ষমতায় আছেন

ডা. এস এ মালেক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক,

শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়; বিশ্বের খুব কম দেশই একজন রাষ্ট্রনায়ক গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে একটানা একযুগ দেশ শাসন করছেন। এরূপ দৃষ্টান্ত খুব বেশি একটা দেওয়া যাবে না। প্রতিবেশি গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী মহিলা হয়েও সুদীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। ভূট্টোকন্যা পিতার স্থলে সমাসীন হয়েছিলেন ঠিক কিন্তু তার শেষ করুণ পরিণতি সবার জানা। মিসেস বন্দেনায়ক আরেক দৃষ্টান্ত। প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের মতো একটা যুদ্ধ বিধ্বস্ত প্রতিবিপ্লবে বিপর্যস্ত ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতায় বিভক্ত, একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রায় ১৭ বছর (১৯৯৬-০১) এবং (২০০৯-২০২০) সাল পর্যন্ত শাসন করা গণতান্ত্রিক ধারায়, স্বৈরশাসককে মোকাবিলা করা, নিশ্চয়ই এক অসাধারণ ঘটনা। বিগত নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় তিনি আরও ৩ বছর ক্ষমতায় থাকার কথা। তাহলে মোট তার ক্ষমতাসীন থাকার সময় দুই দশক পূরণ করবে। বর্তমানে তার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার যে অবস্থান, তাতে করে শরীর সুস্থ থাকলে তিনি যে আরও ৫/১০ বছর দেশ শাসন করতে পারবেন। এরূপ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেন এটা সম্ভব হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সততা, নিষ্ঠা, দর্শন ও গণতান্ত্রিক পথে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া নির্ভীক, দুঃসাহসী, রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে জনগণের দৃঢ় আস্থা অর্জন। যখন যা বলেছেন, তখন তা বাস্তবায়ন করে জনগণের কাছে খুব বিশ্বস্ত এক নেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছেন। শুধু রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নয়; তার সরকার বাংলাদেশের গরীব-দুঃখী মানুষের জন্য যেভাবে কল্যাণমুখী তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মহাবিপদকালে যেভাবে দুঃস্থ জনগণের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, তা বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করছে।

তার পিতা, জাতির পিতা, মহান নেতা, শোষণ-বৈষম্যহীন একটি জনকল্যাণমুখী এক স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রয়োজনে দীর্ঘ ২৩ বছর সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীন করেছেন। স্বাধীন করার পিছনে যে মহান ব্রত কাজ করেছিল;ঠিক অবিকল পিতার মতো সেইসব প্রতিশ্রুতি পালন করে চলেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধন করা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক দর্শন। পিছনের দিকে একটু তাকালে বিস্মিত হতে হয় এই দেখে যে, ৭৫-৯০ পর্যন্ত এই ১৫ বছর সামরিক শাসকদের শাসনামলে দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ এবং সংস্কৃতির বাস্তবতা কি ছিল; আর আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে জনপ্রতি মাথাপিছু গড় আয় ২০৬৪ ডলার, খাদ্যে দেশ স্বয়ং সম্পূর্ণ। বিদ্যুৎ ৯৫ ভাগ মানুষের ঘরে পৌঁছে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৩ বিলিয়ন ডলার, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ, বছরের প্রথম দিনে ৩৭ কোটি বই শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ, ২০-২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন, মেট্রোরেল, কর্ণফুলি ট্যানেল, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, একাধিক উন্নতমানের গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠা, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮%, করোনার প্রভাব সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ-এর সবকিছুই গভীরভাবে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এইতো আর কিছুদিন পরে যখন নিজস্ব গাড়ীতে চড়ে বা যানবাহনে পদ্মাসেতু অতিক্রম করবে, তখন সে কার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, কার নাম স্মরণ করবে, কার ছবি হৃদয়ে ধারণ করবে; তিনি শেখ হাসিনা, দেশরতœ, জননেত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

দায়িত্বহীন, প্রতিসিংসাপরায়ন, বিরোধীদল-বিএনপি বলছে শেখ হাসিনা নাকি গণতন্ত্রের শেষ চিহ্ন টুকুও মুছে ফেলছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের অর্থ যদি হয় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য এই পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণ, তাহলে শেখ হাসিনা প্রকৃত অর্থেই গণতন্ত্রকে মানুষের জীবনে অর্থবহ করে তুলেছেন। তা সত্ত্বেও এটা দাবি করা ঠিক হবে না যে, দেশের সকল সংকটের সমাধান হয়েছে। দেশব্যাপী শান্তির সুবাতাস বইছে। বিশ্বের কোন দেশেই এরূপ বাস্তবতা এখন বিরাজমান নেই। সংকট আছে, দারিদ্র আছে, নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক তবে এগুলিতো আর শেখ হাসিনার শাসনামলে সৃষ্ট নয়। একটা সশস্ত্র বিপ্লবের পর বিপ্লবের মহানায়ক যে প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে হত্যা করে বিপ্লব অর্জনকারী দলকে ক্ষমতাচ্যুত করে বিপ্লবের মূলমন্ত্রকে প্রত্যাখান করে প্রতিক্রিয়ার ধারায় সেই দীর্ঘ সময় (১৯৭৫-৯০) সাল পর্যন্ত যারা দেশ শাসন করেছেন; তারাই সব অঘটনের জন্য দায়ী। যে মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তি; সেই দেশকে কারা, কি কারণে, কিভাবে শোষক গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিল এবং যেধারা এখনো অব্যাহত আছে; যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য শেখ হাসিনা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন, তা বিবেচনায় নিলে বোঝা যাবে যে, পথভ্রষ্ট বিপদগামী একটা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আনতে শেখ হাসিনার শাসনামলের অধিকাংশ সময কেটে গেছে। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক ধারায় যে গুণগত পরিবর্তন আনতে তিনি সক্ষম হয়েছেন, তা নিশ্চয়ই প্রশংসার দাবি রাখে। অনেকে বলছেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ততটা সফলতা অর্জিত হয়নি। তাদের কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন থাকে কোন দেশে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন দলকেই গণতন্ত্রের রক্ষাকবজ হতে পারে? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দলসমূহের কোন ভূমিকা নেই। যদি ধরে নেওয়া হয়; নির্বাচন পদ্ধতি এখনও নিরপেক্ষ ও জবাব দিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

ভোটের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের এখনো সুনিশ্চিত নয়। যদিও সাংবিধানিকভাবে সরকার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। বিরোধীদল বার বার নির্বাচন প্রত্যাখান করে রাজপথে সহিংসতা চালিয়ে হত্যা, জ্বাঁলাও পোড়াও, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ করে যে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে; তাতে করে সরকারী দলের পক্ষে প্রয়োজনীয় সফলতা অর্জন সম্ভবপর হয়নি। তবে একথাও ঠিক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিপন্ন করে যারা দেশকে বারবার স্বৈরশাসনের কবলে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তারাই গণতন্ত্রের মূল শত্রু। তাদের কারনেই গণতন্ত্র সঠিক রূপ লাভ করেত পারছে না। রাষ্ট্র পরিচালনা বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যা, জেল হত্যা এবং যুদ্ধপরাধিদের যেভাবে আইনের শাসনের ধারায় ধৈর্যের সাথে বিচার কার্য্য সম্পাদন করা হয়েছে ও এখনও অব্যাহত আছে, তাতে গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত আইনের শাসনের অনুশাসনে যে শেখ হাসিনা বিশ্বাসী; তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। শেখ হাসিনা আজ এমন এক নেত্রী, যে তার দলের চাইতে দেশের জনগণের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। এই গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠিত করাই হচ্ছে শেখ হাসিনার প্রধান কৃতিত্ব। যে প্রজ্ঞা, মেধা, দূরদর্শিতা, কঠোর পরিশ্রম, দৃঢ় প্রত্যয়, সাহসিকতা, মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, প্রভৃতি কারণে তিনি দেশের জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন, তাই তাকে সুদীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রেখেছে এবং প্রয়োজন বোধে আরও রাখবে। জাতির পিতার কন্যা হিসেবে যে মহান ব্রত নিয়ে তিনি তার পিতার প্রতি শতভাগ অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন; তা আগামীতে কম হলেও শত বছরের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় আছেন বলেই দেশ আজ নিরাপদ। আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনা জনগণ কর্তৃক স্বীকৃত এটা প্রতীয়মান হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*