৩রা নভেম্বর জেল হত্যাকান্ড ছিল ১৫ই আগস্টের হত্যাকান্ডের সম্মূরক

ডা. এস.এ মালেক, বিশিষ্ট কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক

জেল হত্যাকান্ড আমাদের জাতীয় জীবনের আর একটি কলংকিত অধ্যায়। ৩রা নভেম্বর জেলা খানায় বন্দী অবস্থায় যে ৪জন মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় নেতাদের অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল, তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ৭৫এর ১৫ই আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মম ভাবে হত্যার পরও  হত্যাকারীরা ঐ চার নেতাকে জীবিত রাখা তাদের জন্য নিরাপদ মনে করেননি। তারা ভেবেছিল ঐ চার জাতীয় নেতা জীবিত থাকলে পরবর্তীতে কোন এক সময় তারা গণঅভ্যূত্থানের নেতৃত্ব¡ দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেবেন। তাদের পক্ষে গণজাগরণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। খন্দকার মোশতাক আহম্মদ ভাল করেই জানতো আওয়ামী লীগে তার অবস্থানের চেয়ে ঐ চার নেতার গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনেক উপরে। তাদের জেলখানায় রেখে আওয়ামী লীগের নামে সরকার ও সংসদ পরিচালনা করা তার জন্য সম্ভব হবে না। অথবা আন্তজার্তিক পর্যায়ে যে চক্র এই হত্যাকান্ডে সমর্থন দিয়েছিলেন, তারা ভেবেছিল, যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল, তার জয়যুক্ত করতে হলে ঐ ৪ নেতা অবশ্যই তাদের জন্য বিপদজনক ছিলেন। তারা কখনো বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার নিয়ে আপোস করতেন না। তাই তাদের জেলখানায় রেখে দেশ পরিচালনা খোন্দকার মোসতাক বা জিয়া কারও জন্য সম্ভব ছিল না। আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতা বলতে কখনো খোন্দকার মোশতাকে বোঝানো হতো না। তারা সবসময় বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খুনী মোস্তাক ও খুনী জিয়া এবং তাদের আন্তজার্তিক পরার্মশদাতারা প্রায় ৮২ দিন সংসদ কার্যকর রেখেছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার  অধিকাংশ মন্ত্রীদের নিয়ে খুনী সরকার গঠন করা হলো। ভাবটা এমন সবই তো ঠিক আছে এবং অধিকাংশ মন্ত্রীসভার সদস্যরা তার মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়েছেন। খোন্দকার মোস্তাক হয়তো তার আন্তজার্তিক প্রভুদের বুঝিয়েছিলেন যে, একবার বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করতে পারলে বঙ্গবন্ধুকে বাংলদেশের পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হবে।

মৃত বঙ্গবন্ধু যে জীবিত বঙ্গবন্ধুর চাইতেও শক্তিশালী হয়ে আর্বিভূত হবেন, তা তারা ভাবতেও পারেনি। প্রথমবার ৪২ জন সাংসদ দেখা করেন মোস্তাকের সঙ্গে। তাদের বেশ কয়েকজন খুনীদের সহযোগী ছিলেন। তারা চেষ্টা করেছিলেন মোস্তাকের পক্ষে ঘটনা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার। কিন্তু প্রথমবার ৪২ জন সাংসদ দেখা করলেও পরবর্তীতে ২৬২ জন সাংসদকে ডেকে এনে খুনী মোস্তাক এর সাথে বৈঠক করতে বাধ্য করলেও সাংসদরা মোস্তাকের সমর্থন না জানিয়ে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন এবং কি কারণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো, তা জানতে চাইলেন। সৃষ্টি হলো এক অরাজকতাময় পরিস্থিতির। যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে ইন্ধন যুগিয়েছিলেন, তারা বুঝতে পারলেন, মোশতাকের পক্ষে আর ঘটনা প্রবাহ নির্য়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় এবং তখনই সিদ্ধান্ত হয় যে, মোস্তাককে বাদদিয়ে পর্দার অর্ন্তরালে যে ব্যক্তিটি এই হত্যাকান্ডের নায়ক, সেই জিয়াউর রহমান এর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। আসলে তখন আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোন রাজনৈতিক দল ছিলনা, যাদের কাছে খুনীরা ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তখনই সিদ্ধান্ত হলো পাকিস্তানী ধারায় সিভিল বুরোক্র্যাসি ধারায় ক্ষমতা হস্তান্তর হোক। এ ব্যাপারে তাদের বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন জেনারেল জিয়া। বস্তুতঃ নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জেল খানার বাহিরে যেসব হত্যাকান্ড ঘটেছে, তার মূল লক্ষ্য ছিল জিয়াকে রাষ্টের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া।

খুনীরা ও আন্তজার্তিক প্রভুদের বিশ্বস্ত স্থান ছিল সামরিক বাহিনী। একারণে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও দেশ ১৫বছর ২ জন সামরিক শাসক দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। যে দেশটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিণিময়ে স্বাধীন হলো; সেই দেশেই প্রতিষ্ঠিত হলো সামরিক স্বৈরাচার। সশন্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করলেও জাতির পিতা সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে সংবিধান ও সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরেই দেশে সামরিক শাসন জরিকরা হয়। সুতরাং গণতন্ত্র হত্যাকারী কারা; তা বুঝতে কি কোন অসুবিধা হয়। অনেকেই মনে করেন খালেদ মোশররফের নেতৃত্বে যে অভ্যূত্থান হয়েছিল, তার প্রকৃতি ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদী রূপ। কিন্তু বাস্তবে খুনীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার সংশ্লিষ্ট ছিল কারা। জিয়াকে বন্দী করে রাখার পরও কেন তার বিরুদ্ধে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। কেন সে গণবাহিনীর সহযোগিতায় মুক্ত হয়ে ঘটনা প্রবাহের সুযোগ পেল । কেন ঐ সময় সেরা সেরা মুক্তিযোদ্ধাদের অভ্যূত্থানের নামে হত্যা করা হয়েছে। তখনও পর্দার অর্ন্তরালে থেকে জেনালের জিয়া যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা তার ক্ষমতার আসনকে পাকাপোক্ত করা।

আসলে ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ছিল, একটা প্রতিবিপ্লব। এই প্রতিবিপ্লবের ফলে স্বাধীন দেশে যা কিছু অর্জিত হয়েছিল, তা ধ্বংস করায়ছিল মূল লক্ষ্য। তাই দেখা যায়, জিয়ার শাসনামলে স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের সহযোগিতায় স্বাধীন দেশকে পাকিস্তানী ধারায় পরিচালনা করতে। স্বাধীন বাংলাদেশের উপর তিনি সবপদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। কেন তিনি জাতীয়তাবাদ পাল্টে দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান জয় বাংলা পরিবর্তন করলেন। রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাকে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ধর্ম সাপেক্ষ করলেন। তারই শাসনামলে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করা হলো। আন্তজার্তিক পর্যায়ে যাবা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিল, তাদের সাথে সখ্যতা করা হলো। শোষিত-বঞ্চিত ও মেহনতী মানুষের রাজনীতিকে পরিহার করে দ্রুত শোষকের হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ অর্পিত করা হলো। ক্ষমতার ভীতকে মজবুত করার লক্ষ্যে অতি অল্প সময়ে স্বাধীনাতা বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল চালিকা শক্তিতে প্রতিষ্ঠা করা হলো। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে প্রথম সশন্ত্র বিপ্লব সংঘটিত হয়। ২য় বিপ্লব সংঘটিত হয় সংবিধান পরিবর্তন করে। ৭৫ পরবর্তী দীর্ঘ ২১ বছরের রাজনীতি পর্যবেক্ষন করি, তাহলে জিয়া, এরশাদ ও খালেদার শাসনামলে যেভাবে দেশে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় হিসেবে জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা জনগনের ভালোবাসা ও সমর্থনে ক্ষমতায় এসেই তা রুখে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি ৪র্থ বারের মতো দেশপরিচালনার সুযোগ পেয়ে বিশেষ করে বিগত ১২ বছর একটানা শাসন ও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় প্রমাণ করে যে, তিনি প্রতিবিপ্লবের ধারা থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করেছেন।

দেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে। বিশ্বের উন্নয়নের রোল মডেল। তাই এ কথা বলা যায়, এটা প্রতিবিপ্লবের সম্পূরক অধ্যায়, কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঐ প্রতিবিপ্লবের ধারা এখনো সক্রিয় আছে। এটা বাস্তবায়নের জন্য ২১ আগস্ট গ্রের্নেড হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাই আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব শতভাগ নিরাপদ এ রূপ চিন্তা করার কোন অবকাশ নেই। দেশ বিরোধী চক্রান্ত এখনো চলছে। ১৫ আগস্ট এর পর থেকে এ দেশে এক মাত্র শেখ হাসিনার উপর ২০ বার হত্যার চেষ্টা  করা হয়েছে। আর কোন নেতার উপর এ রূপ ঘটনা ঘটেনি। কারণ একটাই শেখ হাসিনাই একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও ৭৫ এর প্রতিবিপ্লবের ধারার বিপরীতে সংগ্রাম করে দেশ কে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। যারা এই ধারা কে কখনো মেনে নিতে পারেননি, তারাই প্রতিবিপ্লবের ধারায় এখনো সক্রিয় আছে। তাই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুনিশ্চিত করতে হলে শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই।

আমি জেলা হত্যা কান্ডে নির্মমভাবে নিহত শহীদ জাতীয় ৪ নেতার অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্ব দিয়ে তারা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। দেশ ও জাতি চিরদিন তাদের আত্মত্যাগ ও কর্মের মূল্যায়ণ করবেন। তাদের রক্তের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। এক মাত্র পথ তাদের নির্দেশিত পথে দেশ পরিচালিত হলেই কেবল তাদের ঋণ পরিশোধ হবে। জাতীয় ৪ নেতা জীবন দিয়ে গেছেন কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে কোন দিনই বেইমানি করেননি। রাজনীতিতে এমন দৃষ্টান্ত খুবই কম দেখা যায়। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তরুণ রাজনীতিবিদ দের এখানথেকে শিক্ষার অনেক কিছু আছে। আজকের এই দিনে মহান জাতীয় ৪ নেতার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ বিনির্মাণ হোক, সেই প্রত্যাশায় রইল। জাতীয় ৪ নেতার অবদান চির ভাস্কর, চির অম্লান, চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমাদের ইতিহাসের পাতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*