মতের মিল-অমিল

রাশেদুল ইসলাম, 

আমার কিছু   ‘হুজুর’ বন্ধু আছেন । লেবাস এবং ধর্মচর্চার দিক দিয়ে আপদমস্তক হুজুর তাঁরা । আমার চোখে তাঁদের প্রত্যেকেই এক একজন সত্যিকার ধার্মিক ব্যক্তিত্ব । আমি নিজে তেমন  ধার্মিক ব্যক্তি নই । তবে সত্যিকার ধার্মিক  কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমার  আছেন- এজন্য আমি গর্বিত । একথা সত্য যে,  কিছু বিষয়ে  মৌলিক  মিল না থাকলে,  কেউ কারো ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে পারে না ।   আমার হুজুর বন্ধুদের সাথে নিশ্চয়ই  আমার কোন কোন বিষয়ে  মৌলিক  মিল আছে । তাই তাঁরা আমার অতিঘনিষ্ঠ জন  । আবার কোন কোন বিষয়ে আমিলও  আছে । আর অমিল আছে বলেই আমরা পুরোপুরি  একে অপরের  মত হতে পারিনে । অবশ্য এই মিল -অমিলের ব্যাপার আছে বলেই পৃথিবী এত  বৈচিত্র্যময়! এত  সুন্দর !!  পৃথিবীর মানুষ এত সুন্দর !!!  

আমার হুজুর বন্ধুদের একজনের নাম মাকসুদ । তিনি বর্তমানে জেদ্দা হজ্ব মিশনে কর্মরত । তিনি মাঝে মাঝেই  আমাকে হেদায়েত করার চেষ্টা করেন । গতকাল  আমার  ইনবক্সে তিনি লিখেছেন,

“এখন বয়স যাদের ৫০৬০ বা বেশী, সময়টা তাদের শেষ আছরেরমতো, গোধূলি লগ্ন। সূর্য লাল হতে চলেছ , একটু পরেই তলিয়ে যাবে এসময় শিশুরা খেলা ছেড়ে ঘরে ফেরে, রাখাল গরু নিয়ে আসে বাড়ী মাঝিরা তাদের নৌকা ভিড়ায় নিরাপদ ঘাটে।বাজার নিয়ে দ্রুত পায়েঘরে ফেরে সংসারী।পাখিরা উড়ে আসে নীড়ে। আবেদ বান্দারা অজুকরে নেয়, পড়তে যাবে সেজদায়,,,,,,, আর আমরা কোথায় আছি”   !!!

একজন মুসলমান হিসাবে আমি নিজেও  পরকালে বিশ্বাস করি । আমিও বিশ্বাস করি,   আমার এই জীবন শেষ জীবন নয় । মৃত্যুর পর আর এক জীবন শুরু করার আগে আমার বিচার হবে । বিচারে এই জীবনের  কৃতকর্মে মহান আল্লাহ্‌ খুশী হোলে আমার বেহেস্ত বা মহাসুখের    নতুন জীবন শুরু হবে । কিন্তু, বিপরীত কিছু হোলে বা বিচারে মহান  আল্লাহ্‌ আমার উপর খুশী না হোলে,  সীমাহীন কষ্টের দোযখ জীবনের শুরু । তবে, একমাত্র মহাপ্রভু আল্লাহর সন্তোষটিই  আমাকে বেহেস্ত জীবন দিতে পারে; অন্য কোন ভাবে তা পাওয়া যাবে না । অন্য কেউ তা দিতেও  পারবে  না । অর্থাৎ, পরকালে একমাত্র নাজাতদাতা মহান আল্লাহ্‌পাক  নিজে ।  এটা নিয়ে আমার হুজুর বন্ধুদের সাথে আমার মতের কোন পার্থক্য  নেই ।

কিন্তু, প্রশ্ন মহান আল্লাহকে খুশি করার উপায় কি ?  

অর্থাৎ, মহান আল্লাহ্‌ কিসে খুশী হন ?

এই প্রশ্নের উত্তর  নিয়েই আমাদের মধ্যে  মত পার্থক্য হয় । আমার হুজুর বন্ধুরা কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যা দেন । তাঁরা বলেন,  মহান সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার  একমাত্র উপায়  তাঁর উদ্দেশে সেজদা করা বা নামাজ পড়া । আমার হুজুর বন্ধু  মাকসুদ সেই কথাটিই আমাকে ফেসবুকের ইনবক্সে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ।

ধর্ম বিষয়ে আমার বন্ধুদের মত আমি শিক্ষিত নই । তবে পবিত্র কোরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী কোরআন হাদিস বোঝার জন্য খুব শিক্ষিত হওয়ার দরকারও  নেই । সূরা কামারে  মহান আল্লাহ্‌ বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য কোরআনকে খুব সহজ করে দিয়েছি, যাতে তোমরা এর শিক্ষা মনে রাখতে পার’ (আয়াত ১৭, ২২,৩২, ৪০) ।  আর, কোন কিছু বোঝার জন্য নিজের ‘সহজাত বিচারবুদ্ধি’ প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে পবিত্র কোরআনে । তারমানে আমার মত সাধারণ মানুষও খুব সহজে কোরআন ও হাদিসের অর্থ  বুঝতে পারার কথা  ।

আমি নিজে কোরআন হাদিস পড়ে বোঝার চেষ্টা করেছি । আমি বুঝেছি নামাজ পড়া একজন মুসলমানের জন্য অত্যাবশ্যক এবং তা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই । তবে, শুধু নামাজ পড়ে মহান আল্লাহকে খুশি করা সম্ভব নয় । পবিত্র কোরআনেও তা বলা হয়নি । যেমন, শেষ বিচার দিনের কথাই বলি । কোরআনে বলা হয়েছে,  ‘সেদিন কোন আত্মীয়তা থাকবে না, কেউ কারো খোঁজ নেবে না । যাদের  পাল্লা (সৎকর্মের)  ভারী হবে, তারাই হবে সফল । আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, … তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম’ (সূরা মুমিনুন, আয়াত ১০১-১০৪) ।  

একই সূরার মর্ম অনুযায়ী একজন মানুষ মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সৎকাজ করার  গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে ।  তখন সে  কাতর  প্রার্থনা করে, “হে আমার প্রতিপালক ! আমাকে একবার পৃথিবীতে ফেরত পাঠাও, যাতে আমি কিছু সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি পূর্বে কখনও করিনি” (সূরা মুমিনুন, আয়াত ৯৯-১০০)।

এখানে সৎকর্ম করার কথা বলা হয়েছে । নামাজ পড়ার কথা বলা হয়নি । সূরা মুমিনুনের ৫৭-৬১ আয়াতে সৎকর্ম কি তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে । সেখানেও নামাজ পড়ার কথা বলা হয়নি । প্রকৃতপক্ষে নামাজ পড়া  সৎকর্মের বিষয় নয় । এটা বিশ্বাসের অঙ্গ ।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে তারা থাকবে নেয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতে” (সূরা হজ্ব, আয়াত ৫৬)।অর্থাৎ  কোরআনের মর্ম অনুযায়ী বিশ্বাসী এবং সৎকর্মশীল ব্যক্তিরাই জান্নাতে যাবে । এই বিধান অনুযায়ী   শুধু বিশ্বাসী বা শুধু সৎকর্মশীল কেউ বেহেস্তে যেতে পারবে না । মহান আল্লাহকে খুশি করে বেহেস্তে যেতে হোলে,  একজন মানুষকে আল্লাহ্‌ বিশ্বাসী হতে হবে এবং একই সাথে সৎকর্মশীলও  হতে হবে । কোন একটিকে বাদ দিয়ে আল্লাহকে খুশি করা সম্ভব নয় ।

আমার হুজুর বন্ধুরা বিশ্বাসী হওয়ার কাজে যতটা তৎপর, সৎকাজ করার ব্যপারে ততটা তৎপর নয় । কোন কোন ক্ষেত্রে  মোটেও  তৎপর নয় । তারা শুধু নামাজ  পড়াকেই একমাত্র ইবাদত মনে করেন ।  কিন্তু, শুধু নামাজ পড়া যদি ইসলামের বিধান হত, তাহলে মহানবী (সঃ) এঁর সাথে তৎকালীন আরবের কারো কোন বিরোধ হত না । তিনি সব সময় হেরা পর্বতের গুহায় বসে নামাজ পড়লে, তাঁর খাবার-দাবার বা সম্মানের কোন অভাব হত না ।  কেউ তাঁর দিকে পাথর ছুড়ে মারার প্রয়োজনও বোধ করত না ।  দাসপ্রথার যুগে তিনি বলেছেন,  কোন মানুষ কারো দাস হতে পারে না । সব মানুষ সমান । কেউ যদি কাজের লোক বাড়িতে রাখে,  তাহলে নিজে যা খায় বা পরে,  তাকে তাই দিতে হবে । তিনি বোঝাতে চেয়েছেন মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব । মেয়েরাও তাই । এ কারণে কোন মেয়ে শিশুকে জ্যান্ত কবর দেওয়া যাবে না । মেয়েশিশুকে  অধিকতর  মর্যাদা দিতে হবে ।  এভাবেই তিনি মানুষকে সৎকাজে আহবান  করেছেন । তাঁর দিকে  পাথর ছোড়া হয়েছে মূলত এ  কারণেই  । তিনি পাথর খেয়েছেন   মানুষকে সৎকাজে আহবান করার কারণে । আর ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মাধুর্য এখানেই । নিজে সৎকাজ করা এবং অন্যকে সৎকাজে উৎসাহ দেওয়া । আমার হুজুর বন্ধুরা সেদিকে যেতে চান না ।

বর্তমান পৃথিবী  করোনা মহামারিতে আক্রান্ত । ভয়াবহ এই মহামারিতে গোটা পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়েছে । আজ  ২৩ মে ২০২০, মোট  করোনা আক্রান্ত  মোট রোগীর সংখ্যা ৫৩ লক্ষ ৩৮ হাজার ৮৪ । মোট মৃত্যু সংখ্যা  ৩ লক্ষ  ৪০ হাজার ৬ শত ১৬ ।  বাংলাদেশে মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা  ৩২ হাজার ৭৮ জন । মোট মৃত্যু সংখ্যা  ৪ শত ৫২ – যা  ক্রমবর্ধমান । করোনা  সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারের আন্তরিকতার বিন্দুমাত্র ঘাটতি নেই । মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি তদারকি করছেন । ইতোমধ্যে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের মত আমাদের দেশেও  মসজিদে জামাতে নামাজ পড়া সীমিত করা হয়েছে । এবার পবিত্র ইদুল ফিতরের নামাজেরও পূর্বের ন্যায় জামাত হবে না ।

ইসলাম ধর্ম সার্বিক  দিক দিয়েই সমৃদ্ধ । যে কোন বিষয়ে,  হাদিস কোরআনের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ রয়েছে । একইভাবে করোনার মত মহামারি চলাকালীন মুসলমানদের কী করণীয় তারও বিধান রয়েছে । সে সব বিধানের আলোকেই এদেশের আলেম সমাজ মসজিদে বা জামাতে  নামাজ না পড়ার বিধান দিয়েছেন । সরকার সে মোতাবেক নির্দেশনা দিয়েছেন । কিন্তু অনেকেই আছেন,  যারা  আলেম সমাজের  সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কথা বলছেন । অথচ, বাস্তবতা হোল ইসলাম ধর্ম পরিবেশ ও পরিস্থিতি বান্ধব ধর্ম । নিজের সক্ষমতার বেশী ধর্মচর্চা  করার বিধান ইসলামে নেই । নামাজ প্রয়োজনে বসে, শুয়ে-  এমনকি ইশারায় পড়ার বিধান রয়েছে । তাই, এই করোনা সংকটকালে কে কোথায়, কিভাবে নামাজ পড়ছে,  সেটা বিষয় নয়; বিষয় হোল এই মহাদুর্যোগে  সামাজিক দূরত্ব মেনে যার যার অবস্থানে থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে রক্ষা করা । একই সাথে বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো ।

অতিসম্প্রতি  ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে দেশ । শুধু উপকূলীয় অঞ্চল নয়,  বলা যায় গোটা দেশ জুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মানুষ । একটানা ১২ ঘণ্টা  ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলা চলার ইতিহাস বাংলাদেশে বোধহয় এই প্রথম । করোনা সংকটে এদেশের নিম্নআয়ের মানুষের এমনিতেই দৈনদশা । তার উপর ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’  এর মত আম্ফানের তাণ্ডব । দেশের সাধারণ মানুষের এই অতি দুঃসময়ে তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো একজন মুসলমানের জন্য অনেক বড় ইবাদত হতে পারে । এটা  সৎকাজের উৎকৃষ্ট একটা উদাহরণও বটে ।

বর্ণিত অবস্থায়, হুজুর বন্ধুদের কাছে আমার আকুল আবেদন, আপনারা  সকলকে  নিয়মিত নামাজ পড়তে বলুন;  ঠিক আছে । এর  পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে সৎকাজে অংশ নেওয়া যে, নামাজ পড়ার মত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত-  এ কথাটিও বলুন । আমার মত মানুষ নিজে যত কথায় বলি না কেন, কেউ শুনবে না । কারণ, ধর্ম বিষয়ে আমি আপনাদের মত সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য  কেউ নই ।

মহান আল্লাহ্‌ আমাদের সহায় হো্ন ।

সকলকে পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা ।
উত্তরা, ঢাকা, ২৩ মে, ২০২০ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*