করোনা- বাজার।

রাশেদুল ইসলাম

বাসায় কাঁচা মরিচ নেই । আনতে হবে । আমরা করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে চাই । তাই, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হচ্ছে । সবাই যারযার বাসায় বন্দী আমরা । অতিজরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাসার বাইরে যাওয়া নিষেধ । আচ্ছা, কাঁচা মরিচ আনা কি অতিজরুরি কোন কাজ হবে ?

এই ‘অতিজরুরি’ বিষয় নিয়ে আমার মনে একটা দ্বন্দ্ব আছে । ছাত্রজীবনে একবার এক বন্ধুর বাড়িতে একটা আনন্দ উৎসবে পড়ি । আমি উৎসবের কারণ জানতে চাই । একজন জানান, ‘বাবা প্রস্রাব করেছে’ । আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে রাখি । ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করি । জানতে পারি তাদের বাবার হটাৎ প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় । কোন ডাক্তার- কবিরাজে কাজ হচ্ছিল না । কার ঔষধে কাজ হয়েছে জানা নেই; তবে সেদিন সকাল থেকেই তার বাবার স্বাভাবিক প্রস্রাব হওয়া শুরু হয়েছে । তাই, এই আনন্দ উৎসব । ছোটছেলে এক দৌড়ে বাজার থেকে অনেক মিষ্টি এনেছে । এ কয়দিন পরিবারে যে হাহাকার নেমে এসেছিল, বাবার প্রস্রাব হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই গুমট ভাবটা কেটে গেছে । পরিবারে তাই উৎসবের আমেজ । আসলে অতিজরুরি কোন বিষয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের একান্ত নিজস্ব ব্যাপার । অন্যের কাছে সেটা অর্থহীন মনে হতে পারে; কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে তা ‘অতিজরুরি’ ।

গতকাল একজন অফিসার আমার কাছে তাঁর দুঃখের কথা বলেন । তিনি নিজের জন্য ঔষধ আনতে যাওয়ার পথে তাঁকে নাজেহাল করা হয়েছে । এখন মাঠ পর্যায়ে যারা দায়িত্ব পালন করছেন, নিঃসন্দেহে তাঁরা অনেক বড় কাজ করছেন । জাতীয় দায়িত্ব পালন করছেন । তাঁরা সবাই এদেশের সন্তান । আমাদের জরুরি –অতিজরুরী বিষয়গুলো তাঁদের না বোঝার কথা নয় । তাঁরা যদি তাঁদের এই কঠিন দায়িত্ব পালনের মধ্যে যৌক্তিকতা এবং মানবিকতার বিষয়টি মাথায় রাখেন; তাহলে এ ধরণের দায়িত্বপালন তাঁদের জন্য অনেক বড় ইবাদত হতে পারে । সরকারি দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে ইবাদতের কাজ করা অনেক বড় ব্যাপার । সবাই এ ধরণের সুযোগ পান না । আমি অনুরোধ করব সংশ্লিষ্ট সকলে যেন বিষয়টি অনুধাবন করেন ।

আমি বলছিলাম কাঁচা মরিচের কথা । কাঁচা মরিচ সামান্য বিষয় । কিন্তু রান্নার কাজে এর গুরুত্ব অসামান্য । কাজেই আমাকে বেরুতে হয় । এই বিরান শহরে কাঁচা মরিচের খোঁজে বেরুতে হয় ।
এ রকম জনমানবশুন্য ঢাকার রাস্তা খুব একটা পাওয়া যায় না । আমি হাঁটার গতি বাড়ায় । লক্ষ্য ফুটপাতের বাজার- যেখানে কাঁচা মরিচ পাওয়া যায় । ছেলেবেলায় হাট ও বাজারের পার্থক্য আমার জানা ছিল না । অনেক পরে তা জেনেছি । আমার জানামতে, যেখানে সপ্তাহের নির্দিষ্ট এক বা একাধিক দিনে পণ্য বেচাকেনা হয়, তাকে হাট বলে । আর, যেখানে নির্দিষ্ট কোন দিন নয়, প্রতিদিনই পণ্য বেচাকেনা করা হয়, সেটা বাজার । সে দিক দিয়ে ঢাকা শহরের ফুটপাতের বাজারই মনে হয় শাশ্বত বাজার । কারণ, যে কোন অবস্থায় ঢাকা শহরের ফুটপাতে অনেক দরকারি জিনিষ পাওয়া যায় ।

আমার ধারণা ছিল এই দুঃসময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় শাকসব্জির দাম অনেক বেশী হবে । তাই, বেশী দাম দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই আমার যাওয়া । কিন্তু, মজার ব্যাপার ফুটপাতের এই অতিঅল্প পুঁজির মানুষগুলো তাঁদের মালামালের দাম মোটেও বাড়ায়নি । আমি নিজে বাজার করি । বাজার দাম আমার জানা । তাঁরা ন্যায্য দামেই সবকিছু বিক্রি করছে । বঙ্গবন্ধু একবার অনেক দুঃখে বলেছিলেন-
‘দুর্নীতি আমার বাংলার কৃষক করেনা, দুর্নীতি আমার বাংলার শ্রমিক করেনা, দুর্নীতি করে আমাদের শিক্ষিত সমাজ’ ।

তারমানে দুর্নীতি আমি এবং আপনি- এই আমরা করি । আমরা এখন গৃহবন্দি আছি । অনেকটা নিজের মুখোমুখি আছি । আমরা বোধহয় আমাদের জীবনযাপন পদ্ধতি ও করণীয় বিষয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এখন নিতে পারি ।

শুভ কামনা সকলের জন্য ।

ঢাকা, ২৭ মার্চ, ২০২০ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*