মাতৃভাষা মায়ের মতো, রাখতে হবে সবচেয়ে উঁচুতে

ভাষাসৈনিক কাজী এবাদুল হক বলেছেন, মাতৃভাষা মা, মায়ের মতো। এ ভাষাকে সবচেয়ে উঁচুতে রাখতে হবে। এর ব্যবহারে সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। যখন দেখি মায়ের এ ভাষাকে অপমান করা হচ্ছে, খুব কষ্ট হয়। সহ্য করতে পারি না। ভাষা সংগ্রামের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে এ কথা বলেন সুপ্রিমকোর্টের সাবেক এ বিচারপতি।

এদিন আরেক ভাষাসৈনিক কবি, প্রবন্ধকার ও গবেষক আহমদ রফিক যুগান্তরকে বলেন, আমি মনে করি একটি মানুষের সবচেয়ে খারাপ দিক মাতৃভাষাকে অসম্মান করা। আমি ইংরেজি ভাষার বিরোধী নই, তবে এটা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিখতে হবে। আমার ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশ রক্ত দিয়ে, প্রাণ দিয়ে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, ভাষা সংগ্রামের ৬৮ বছরের সেই দেশে বাংলা সর্বস্তরে চালু করা যায়নি।

ভাষাসৈনিক ড. শরিফা খাতুন বলেন, রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছিল আমাদের প্রাণের দাবি। সেই আন্দোলনে অনেকের রক্ত ঝরেছে, প্রাণ গেছে। এ ভাষার প্রতি অবহেলা, অমর্যাদা খুবই কষ্ট দেয়। ঢাকা

বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপক বলেন, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর যে দাবি, তা যেন বাস্তবায়িত হয় সেটাই প্রত্যাশা করি। মাতৃভাষার মর্যাদার শিক্ষাটা পরিবার থেকেই আসতে হবে।

বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ২০১৬ সালে একুশে পদক পেয়েছেন। ফেনীতে জন্ম নেয়া এ সংগ্রামী ১৯৫২ সালে ফেনী কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। সে সময় ফেনীতে ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৫৪-৫৫ সালে তিনি ফেনী ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ছিলেন।

এবাদুল হক বলেন, ভাষা আন্দোলনের সময় আমি ফেনীতে ছিলাম। ফেনী কলেজের ছাত্ররা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতেন। সেখানে ১৯৪৮ সাল থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়। তবে ১৯৫২ সালে আন্দোলন জোরদার ছিল বেশি। একুশে ফেব্রুয়ারি ফেনীতে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না।

সন্ধ্যার পর ফেনীতে খবর আসে ঢাকাতে গোলাগুলি হয়েছে, কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। এ খবর আসামাত্র আমরা হোস্টেল থেকে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। শহরের বিভিন্ন বাসা ও মেসে থাকা ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষসহ এতে যোগ দেয়। সেই আন্দোলন বেশ কয়েকদিন ধরে চলে। আমরা কমিটির পক্ষ থেকে ফেনী শহরের বাইরের যত স্কুল ছিল একেকজন একেক স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের সংগঠিত করি।

সাবেক এ বিচারপতি বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও বলতে চাই, ভাষা শক্তি, সাহস, পরিচয়ও। আজ এ ভাষাকে অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। গ্রামগঞ্জেও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চলে গেছে। ইংরেজি শেখা উচিত, তবে মাতৃভাষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এটি পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র-সব স্থান থেকেই নিশ্চিত করতে হবে। শিশুরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ছে, আমার নাতিও পড়ছে, কিন্তু তারা যেন মাতৃভাষাকে মূল ভিত্তি রাখে।

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে গবেষণাকর্মের জন্য ঠাকুর রিসার্স ইন্সটিটিউট তাকে রবীন্দ্রাচার্য উপাধি দেয়। একজন প্রতিবাদী মানুষ হিসেবে প্রায় সব প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে পেয়েছেন একুশে পদক।

আহমদ রফিক যুগান্তরকে বলেন, স্কুলজীবন থেকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সেই ধারাবাহিকতায় মেডিকেল কলেজে এসেও ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হই। ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের সংগঠিত করে পোস্টার ও লিফলেট দিয়ে ছাত্র জনমত তৈরির কাজে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত ছিলাম।

প্রতিটি মিছিল-সভা-সমাবেশে অংশ নিয়েছি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বায়ান্নতেই শুরু হয়নি। ১৯৪৮ সালের মার্চে শুরু হয়। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিম উদ্দিন পল্টন ময়দানের জনসভায় বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়।

এ ভাষাসৈনিক বলেন, আমি বরাবরই বলি ১৪৪ ধারা না ভাঙলে যেমন একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলন সফল হতো না, তেমনি গুলি না চালালে আমরা আজ একুশে পেতাম না। এর ফলে দেখা গেল পুরো পুরান ঢাকার লোকজন মেডিকেল কলেজের দিকে আসতে শুরু করল। পরের দিন গায়েবি জানাজা হয়।

আহমদ রফিক বলেন, প্রাণের বিনিময়ে মাতৃভাষা, রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষা। মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন মানেই শুধু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা নয়। বাঙালি জনগোষ্ঠীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার; সেই অধিকার আদায়ের চিন্তাগুলো এর সঙ্গে জড়িত ছিল।

তিনি বলেন, আজ শিক্ষাক্ষেত্রে জাতিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ফলে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বেশি সুযোগ পাচ্ছে, আর এই প্রতিযোগিতায় গরিব ও দরিদ্র শ্রেণির বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পাচ্ছে না। ড. শরিফা খাতুন অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

তিনি বিচারপতি কাজী এবাদুল হকের স্ত্রী। ’৫২-তে ভাষা আন্দোলন চলাকালে তিনি ইডেন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। থাকতেন কলেজের হোস্টেলে। এ কলেজের ছাত্রীদের সংগঠিত করতে তার রয়েছে ভূমিকা। ২০১৭ সালে একুশে পদক পাওয়া এ ভাষাসৈনিকের জন্ম ১৯৩৬ সালে।

শরিফা খাতুন বলেন, ১৯৪৮ সাল ছিল ভাষা আন্দোলনের সূচনার সময়। আমি তখন নোয়াখালীর উমা গার্লস হাইস্কুলে পড়ছিলাম। তখন আমাদের স্কুলের ছাত্রীরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতির দাবিতে মিছিল করে। আমি প্রথম সেখানে অংশ নিই। ১৯৫২ সালে ইডেন কলেজে ভর্তির পর ভাষা আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ি।

ঢাকায় খাজা নাজিম উদ্দীনের ঘোষণার পর ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। পরদিন আমরা মিছিল বের করি। কলেজ থেকে মিছিল নিয়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে যাই।

এ অধ্যাপক বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। সাধারণত আমরা মেয়েরা সহজে কোথাও যেতে পারতাম না। ওইদিন আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম যে করে হোক আন্দোলনে যাব। সকালে ব্যানার ও কালো ব্যাজ পরে হোস্টেল গেটে এসে দেখি তালা দেয়া হয়েছে। ওই সময় ২০-৩০ জন ছিলাম। কিছুতেই তালা ভাঙতে পারছিলাম না। তখন আমরা দেয়াল টপকে মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম।

ড. শরিফা খাতুন বলেন, বায়ান্ন থেকে একাত্তর, একাত্তর থেকে গৌরবের বাংলাদেশ অর্ধশতাব্দী পার করতে যাচ্ছে। দেশ উন্নত হচ্ছে। কিন্তু আজও আমরা সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করতে পারিনি। এতে ভাষা শহীদদের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানো হচ্ছে। দিন দিন পশ্চিমা অপসংস্কৃতি অনুপ্রবেশ করছে আমাদের জীবনাচারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*