দৃশ্যমান হলো সেতুর ৩ হাজার ৭শ’ মিটার

পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে ২৯ ও ৩০ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হলো ২৫তম স্প্যান। সেতুর নির্মাণকাজের অংশ হিসেবে আরো একটি স্প্যান যুক্ত হওয়ায় ভাষার মাসে এ নিয়ে ৩টি স্প্যান বসানো হলো সেতুতে। ২৫ তম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর ৩ হাজার ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হলো। শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে স্প্যানটি বসানোর খবর নিশ্চিত করেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্টরা। সেতুতে ২৫তম স্প্যান বসানোর পর আর ১৬টি স্প্যান বসানো হলেই পুরো সেতু দৃশ্যমান হবে, পূরণ হবে গোটা জাতির স্বপ্ন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল করিরম মুরাদ জানান, শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টায় ধূসর রঙের ১৫০ মিটার দৈর্ঘ্যের তিন হাজার ১৪০ টন ওজনের স্প্যানটিকে মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে তিন হাজার ৬০০ টন ধারণক্ষমতার ‘তিয়ান ই’ ভাসমান ক্রেন বহন করে রওনা করে। সেতুর ২৯ ও ৩০ নম্বর পিলারের কাছে পৌঁছায় সকাল ১১টার দিকে। ভাসমান ক্রেনটি নোঙর করে পজিশনিং করে ইঞ্চি ইঞ্চি মেপে স্প্যানটিকে তোলা হয় পিলারের উচ্চতায়। পরে দুই পিলারের বেয়ারিংয়ের ওপর রাখা হয় স্প্যানটিকে। খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আগে থেকেই বিশেষজ্ঞ প্যানেল দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে বসোনার যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্প্যানটি খুঁটির উপরে নিয়ে আসা হয়। ঠিক ৩টার স্প্যানটি সফল ভাবে খুটির ওপর বসানো সম্পন্ন হয়। চলতি ভাষার মাসের ২ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৩তম স্প্যান। ১১ ফেব্রুয়ারি বসেছে ২৪তম স্প্যান। আর আজ২১ ফেব্রুয়ারি ২৫তম স্প্যান বসানো হলো।

পদ্মা সেতু প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই মাসে পদ্মা সেতুতে সবগুলো স্প্যান বসানো শেষ হয়ে যাবে এবং আগামী বছরের জুলাই মাস নাগাদ সেতুর ওপর দিয়ে যান চলাচল করবে। একই সঙ্গে বেশিরভাগ পিলার প্রস্তুত হওয়ার ফলে এখন প্রতি মাসে তিনটি করে স্প্যান বসানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে জানুয়ারি মাসে বসেছে দুটি স্প্যান এবং চলতি মাসে বসল তিনটি স্প্যান। পুরো সেতুতে মোট পিলারের সংখ্যা ৪২টি। প্রতিটি পিলারে রাখা হয়েছে ছয়টি পাইল। একটি থেকে আরেকটি পিলারের দূরত্ব ১৫০ মিটার। এই দূরত্বের লম্বা ইস্পাতের কাঠামো বা স্প্যান জোড়া দিয়েই পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে।

৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি তৈরি হচ্ছে ৪১ স্প্যানে। এই ৪১ স্প্যানের ৩৭টিই মাওয়ায় পৌঁছেছে। যার ২৫টি স্থাপন হয়েছে এবং বাকিগুলো স্থাপনে কাজ চলছে। বাকি চারটি স্প্যানের মধ্যে চীন থেকে আসা দুটি স্প্যান রয়েছে এখন সমুদ্র পথে। এই দুটি স্প্যান শীঘ্রই মাওয়ায় এসে পৌঁছবে। আর বাকি দুই স্প্যান চীনে রয়েছে। স্প্যান তৈরি শেষ। এখন এই দুটি স্প্যানে রঙের কাজ চলছে। পদ্মা সেতুর এই স্প্যান তৈরি হয়েছে চীনের উহানে। এই উহান শহর থেকেই করোনাভাইসের উৎপত্তি। সেখানে করোনাভাইসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে মারাত্মকভাবে। এটি শিল্প এলাকা। এই এলাকায় মানুষের এখন ঘর থেকে বের হওয়া নিষিদ্ধ। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ সব বন্ধ করা হয়েছে। তবে পদ্মা সেতুর কাজ স্প্যানের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় ঝুঁকি আর নেই।

ফাইল ছবি।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, মূল পদ্মা সেতুর নির্মাণে প্রায় ৫ হাজার ৩০০ বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করছেন। একই সঙ্গে ৬শ’ ৬০ চীনা প্রকৌশলী ও স্টাফ আছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ নানা দেশের ১৩০ জন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রকল্পে যুক্ত থাকা বিদেশীরা সকলেই সুস্থ আছেন। চীনা নববর্ষ উদ্যাপন করতে মধ্য জানুয়ারিতে চীনে স্বজনদের কাছে গিয়ে ছিলেন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ৩০ শতাংশ চীনা। হুবেই প্রদেশ থেকে ছুটি কাটিয়ে ৩০ জন চীনা ফিরে এসে কাজে যোগ দেন। তবে পরে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। তবে সকলেই করোনামুক্ত আছেন। এখানে সবার জন্য মাস্ক, গ্লাভস পরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চীনাদের জন্য আগের থেকে আলাদা আবাসন করা হয়েছে। আলাদা খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। করোনাভাইরাস প্রভাব এখনও এখানে পড়েনি। কার্যক্রম এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক। সর্বশেষ খবরানুযায়ী দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে পদ্মাসেতু প্রকল্পের মূল কাজ। কারো যেন দম ফেলার ফুসরত নেই। দিন রাত সমানতালে কাজ করছে সেতুর কাজে নিয়োজিত সংশ্লিষ্টরা। কোন ক্লান্তি নেই। সবার চোখে মুখে হাসির ঝিলিক। নিজেদের অর্থে নির্মাণ হচ্ছে দেশের দীর্ঘতম এই সেতু । আর দেশের দীর্ঘতম সেতুতে কাজ করছে বলে গর্বে তাদের বুকটা ফুলে ওঠে।

একের পর এক স্প্যান বসানোয় দৈর্ঘ্য বেড়ে চলছে পদ্মাসেতুর। গাড়ি ও ট্রেনে চড়ে পদ্মা পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন এখন ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে। রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চল থেকে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে আরকিছু দিন পরেই। সাধারণ মানুষের স্বপ্নের কথা ভেবে এখন সেতুতে স্প্যান উঠছে সমান তালে। ২৪ তম স্প্যান বসানোর মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে স্থায়ীভাবে বসলো ২৫ তম স্প্যানটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*