আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এখনো হুমকির মুখে: ডা. এস এ মালেক

বিডিনিউজ২৪: ডা. এস এ মালেক, লেখক ও কলামিস্ট। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা অর্জনে ভয়াবহ ক্ষয়-ক্ষতির স্বীকার হতে হয়েছে। কোন দেশের স্বাধীনতা অর্জনই সহজ সরল পথে সম্ভব হয় না। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন যতটা কঠিন, তার থেকে আরও কঠিন আরও এই স্বাধীনতা সংরক্ষন। ক্রমবিকাশের ধারায় স্বাধীনতাকে সুসংহত করতে হয়। সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৮ বছর। এক চরম বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াশীল অভ্যন্তরীন শক্তি ও সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ মাত্র ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন করা হয়েছে।

২৪ বছরের বেশি সময় আন্দোলন ও সংগ্রামের ইতিহাসে কিন্তু কম সময় নয়। তাছাড়া স্বল্প সময়ে দেশ স্বাধীন হলেও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ দাড়িয়েছে অনেক বেশি। দখলদার বাহিনী যে পোড়ামাটির নীতি অনুসরণ করে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, বাংলাদেশ ও বাঙালিকে বিধ্বস্ত হতে হয়েছে। অর্থনীতিকে ধ্বংস করার জন্য যা করা প্রয়োজন ও ভবিষ্যতে যাতে বাংলাদেশ অগ্রসর হতে না পারে, সেই লক্ষ্যে হাতে রেখে হানাদার বাহিনী সোনার বাংলাকে শ্মাশনে পরিণত করেছিল। এত ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের যখন স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, আজ আমরা গর্বিত। আজ আমরা একটা স্বাধীন জাতি, আমরা একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক। বিশ্ব সভায় আজ আমরা সমাদৃত। কিন্তু এ কথা মনে রাখা দরকার, স্বাধীনতা কোন চিরস্থায়ী ব্যবস্থাপনা নয়। বহুজাতি স্বাধীন হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতা সংরক্ষণ করতে পারেনি। আবার অনেক জাতি স্বাধীন আছে কিন্তু সার্বভৌমত্ব নেই। বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেমন সম্পদ, প্রযুক্তি ও অস্ত্রবলে বলিয়ান, বৃহৎ রাষ্ট্রসমূহ অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রসমূহকে তাদের প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভূক্ত রেখে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্¦কে ক্ষুন্ন করছেন।

উদাহরণ স্বরূপ, দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বৃহত্তম ক্ষমতাশালী দেশ ভারত হওয়ায় এতদ্বঞ্চলের অন্যান্য দেশ সমূহকে সমীহ করে চলার নীতি গ্রহণ করতে হচ্ছে। শুধু ভারত নয়; চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও এরূপ প্রভাব বলয় আছে। মেক্সিকো স্বাধীন কিন্তু মার্কিন প্রভাব বলয়ের বাইরে নয়। হংকংয়ে সম্প্রতি যা ঘটছে, তা চায়নার আধিপত্ত্য বিস্তারের কারণে। আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে এবং সেখানে অনুপ্রেরণা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে ভারত। একথা সত্য যে বাংলাদেশ স্বাধীন করতে গিয়ে ভারতের ১৭ হাজার সৈন্য শহীদ হয়েছে। বিপুল পরিমান সম্পদ ব্যয় করতে হয়েছে। গণকর আদায়ের মাধ্যমে তা কয়েক বছর ধরে পূরণ করা হয়েছে। তাই স্বাধীন বাংলাদেশের উপর ভারতের একটা মনস্তান্তিক চাপ থাকা স্বাভাবিক। যে দলই বাংলাদেশ এই ক্ষমতাসীন হোকনা কেন, মনস্তান্তিক চাপের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হয়। তাছাড়া বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান এমন যে, নদী বিধৌত দেশটির প্রায় সবকটি নদীর উৎসমুখ ভারতে, যা সুদীর্ঘ পথ ভারতের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছ। প্রাকৃতিক বাস্তবতা এমন যে, ইচ্ছায় হোক, আর অনিচ্ছায় হোক, ভারত তার প্রবাহিত নদী সমূহের পানির ব্যবহার করতে গিয়ে বাংলাদেশের জন্য সংকটের সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া ১৩০ কোটি মানুষের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে; বাংলাদেশকে স্থিতিশীল করা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন।

এ কথা সত্য স্বাধীন বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদ ও জনবল শক্তির উপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বৃহৎ দেশগুলির সাথে সমন্বয় সাধন করে; দ্রæত উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে ভারতও সহযোগি শক্তি হিসেবে কাজ করছেন। এতদ সত্বেও বাংলাদেশ সব সময় একটা মনস্তান্তিক চাপের কথা স্মরণ করেই কাজ করতে হয়। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বলতে যা বোঝায় আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক বিষয় এক নয়। মনমানসিকতা, চিন্তা চেতনার স্বাধীনতা বোধের উপস্থিতি প্রয়োজন। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনের অভিজ্ঞতায় আমার মনে হয়, আমাদের স্বাধীনতাবোধ, যা একটা স্বাধীন দেশের জনগণের থাকা উচিত, তা ততটুকু আছে কি না সন্দেহ। ভারত অবশ্যই আমাদের বন্ধু রাষ্ট্র। এই বন্ধুত্ব যেন কোন অবস্থায় আমাদের স্বার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন না করে, সে ব্যাপারে উভয় দেশের সরকার ও জনগণের পরস্পরের সহযোগিতা করা দরকার। আজকের বিশ্বে অঞ্চল ভিত্তিক যে সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তাতে বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে সহজভাবে সমঝোতা ভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতায় সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজন শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর।

অভ্যন্তরীণ যে শক্তি সুদীর্ঘ চার দশক পরেও আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্বরূপ, তা হচ্ছে এক কথায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। যারা বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বিরোধীতা করে আসছে। স্বাধীন বাংলাদেশ বলতে যে চেতনা মূল্যবোধ আমরা ধারণ ও লালন করি, স্বাধীনতা বিরোধী সাম্প্রাদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, তাতে বিশ্বাসী নয়। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্রীয় সমাজ দর্শন, তাই বাংলাদেশকে কখনো মেনে নিতে পারে না। কেন না আমাদের জাতীয়তাবাদের প্রাণশক্তি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সহনশীলতা। এইসব মূল্যবোধকে আশ্রয় করেই বাঙালি একটা কমপ্যাক্ট জাতি। এখানে কোন শিথিলতা নেই। নেই কোন বিভ্রান্তি। তাই যে কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি হিসাবে অবস্থান নিয়েছিল, একই কারণে তারা আজ আমাদের রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করলেও স্বাধীনতার প্রতি হুমকি এখনও রয়েছে। তাই স্বাধীনতা লাভের ৪৮ বছর পরেও আমরা এক সুরে, এক ভাষায় কথা বলতে পারছি না। বাংলাদেশে এখন কোন ঐক্যবোধের কোন সামগ্রিকতা নেই। অর্র্থনৈতিক কারণে শ্রেণীগত বিভেদ থাকা স্বাভাবিক ও আছে। নিরন্তর শ্রেণী সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় হয়তো বাস্তবতার নিরীক্ষায় একদিন তার অবসান হবেই। কিন্তু চিন্তা, চেতনা, অনুভুতি ও সমাজ দর্শনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন গোষ্ঠি ও সম্প্রদায়ের ভিতর যে বিপরীত মুখী প্রক্রিয়া সক্রিয়বান, তার অবসান ঘটিয়ে, বাংলাদেশকে একটা নিরংকুশ জাতিয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করা কঠিন কাজ। যে ধরণের সহনশীলতা পারস্পারিক মূল্যবোধ ও সমঝোতামূলক মানসিক প্রস্তুতি থাকলে সর্বাত্মক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলেও একটা কার্যকর সমঝোতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য অত্যন্ত জরুরী। বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলসমূহ একে অপরের শত্রæ ও দেশ বিধ্বংসী বলে মনে করেন। এ কথা ঠিক যে, তেল ও পানিতে যতই চেষ্ঠা করাই হোকনা কেন, একত্রে মিশানো সম্ভব নয়। একইভাবে স্বাধীনতার চিন্তা চেতনার সমন্বয় এক অসম্ভব ব্যাপার। স্বাধীনতা বিরোধীরা যে পদ্ধতিতে রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ বিশ্বাস করেন, স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি তার সাথে আপোশ করতে পারেন না। তাই বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশটির সামগ্রিকভাবে জনসংখ্যা ভিত্তিক একটা সমন্বিত উদার সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা সুদূর পরাভূত।

আর বিদ্যমান এই দুই শক্তি অর্থ্যাৎ স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি যদি যুদ্ধাংদেহি মনোভাব নিয়ে পরস্পর বিরোধী ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকর্ম চালিয়ে যায়, তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ শান্তি প্রতিষ্ঠিত করণ প্রক্রিয়া সবসময় অস্থিতিশীল থাকবে বলে মনে হয়। একমাত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করেই স্বাধীনতা বিরোধীরা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির সাথে সমঝোতা করতে পারে। জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মাধ্যমে নয়। বাংলাদেশের যারা গণতন্ত্র বিশ্বাস করেন, তারা কখনোই জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। তাই স্বাধীণতা বিরোধীরা দেশে বিদেশে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শান্তির ধর্ম ইসলামকে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে হয়তো মনে করেন সামগ্রিক যুদ্ধের মাধ্যমে হয়তো এর সমাধান হতে পারে। আলজেরিয়া, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইরাকের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব। সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ সক্রিয় রেখে কোন দেশের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। এই নিয়ে বাংলাদেশের সমাজ গবেষকদের চিন্তা ভাবনা করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*