ডিজিটাল বাংলাদেশঃ ডিজিটাল সন্তান।

রাশেদুল ইসলাম,
আমার
ক্যামেরা ভীতি আছেক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে কেমন যেন ভয় পাই আমিএক ধরণের লজ্জাও  পাইএজন্য পারতপক্ষে আমি আমার লেখায় নিজের কোন ছবি ব্যবহার করিনেমিডিয়া হলে তোকথা নেই আগেই মাফ চেয়ে বসি আমি তারপরও পেশাগত কারণেআমাকে  মাঝে মাঝে মিডিয়ার ক্যামেরায় আসতে হয়তখন কাউকেজানানো তো দুরের কথা; মনে মনে দোয়া করি  কেউ যেন  সেই অনুষ্ঠানটা না দেখেঅবশ্য আমার স্ত্রী ব্যাপারটা পুষিয়ে নেওয়ারচেষ্টা করেন তিনি যতটা পারেন,  ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার চেষ্টা করেনযে, তাঁর স্বামীকে কোথায় কোথায় দেখা গেছেআমাকেও তিনি বাধ্যকরেন তাঁর সেই  প্রচারে লাইক বা শেয়ার করার জন্যতবে, গতকালেরদিনটি  ভিন্নগতকাল ছিল ১৬ অক্টোবর, ২০১৯ । ডিজিটাল ডিভাইসএন্ড ইনোভেশন এক্সপো২০১৯ এর শেষ দিন ।  সারাদিনই আমাকেবঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে থাকতে হয়সেখানে স্টলগুলোঘুরে দেখতে গিয়ে মাশফি  এবং স্যামের পাশে আমি দাঁড়িয়ে যাই একজন আমাদের ছবি তুলে দেন মাশফি এবং স্যামের সাথে তোলাসেই দুটি ছবি আমি এখানে শেয়ার করছি

মাশফিঃ 

মাশফির কথা আমি প্রায়ই বলি ।  সেদিন সাউথইষ্ট  বিশ্ববিদ্যালয়েএকটা লেকচার দেওয়ার সুযোগ হয় আমার সেখানেও বলেছিমাশফি৭ম শ্রেণির ছাত্র ইনোভেশন  মেলায় সে তার দ্রোণ (Drone) নিয়েএসেছেতার উদ্ভাবিত দ্রোণটি  এখনকেজি পরিমাণ ওজন নিয়ে ১  মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে  । শুধু উড়তে পারে তা নয়; উড়ন্ত অবস্থায়মাশফির সাথে যোগাযোগ রাখতে পারেতার নিজের অবস্থান জানাতেপারেমাশফি আসলে একটা শক্তিশালী উদ্ধারকারী দ্রোণ  বানাতে চায়; যেটা রানাপ্লাজা বা বনানী ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মত দুর্যোগেউদ্ধার কাজে অংশ নিতে পারে

স্যামঃ

স্যামের সাথে এবার প্রথম পরিচয়  আমারসে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ।  মাথায়  হ্যাট পরাসে  রোবট বানাতে চায় ।  সে তার রোবটের বিভিন্নঅঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ আমাকে বোঝাতে থাকেআমি অবাক বিস্ময়ে তারবিশ্লেষণ ভঙ্গি দেখি

এরা দুজনেই ডিজিটাল বাংলাদেশের ডিজিটাল সন্তান ।  আমি মনেকরি,  মৌসুমি  ফল যেমন মৌসুমি বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক হিসেবেকাজ করে;  ডিজিটাল মৌসুমের যে ডিজিটাল সমস্যা তার প্রতিকারএই ডিজিটাল মৌসুমের সন্তানেরাই দিতে পারে

সুখের কথা এখন শুধু ঢাকা শহর  নয়; সারা বাংলাদেশ জুড়েধরণেরমাশফি   এবং স্যাম ছড়িয়ে আছেএসব ছেলেমেয়েদের মা বাবাকেআমার আন্তরিক অভিনন্দনস্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতিআমার বিনীত অনুরোধ;  এধরণের প্রতিভাসম্পন্ন সন্তানদের আপনারাচিহ্নিত করুন  এবং   তাদের যথাযথ প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিনসরকার থেকেও বিভিন্নভাবে ধরনের সন্তানদের উদ্ভাবনে সহযোগিতা দেওয়া হয়ে থাকেসেই সুযোগের সন্ধানও তাদের দেওয়া যেতে পারে

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মুল চালিকাশক্তি হব নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ।  নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তার বিষয়টিনিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ খুব সহজেই এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতেপারবেতবে, কাজে আমাদের ডিজিটাল সন্তানদে সক্রিয়অংশগ্রহন খুবই জরুরী

মাশফি এবং স্যামের মত দুজন ক্ষুদে বিজ্ঞানীর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেআমি যেমন গর্ব  অনুভব করেছি; ভবিষ্যতে  বিশ্বের অনেক খ্যাতনামামানুষেরা আমাদের চতুর্থ শিল্পবিজয়ী এসব সন্তানদের পাশে দাঁড়াতেএকইভাবে গর্ববোধ করবেএমন প্রত্যাশা করি

(দুই)

কয়েকজন মায়ের কথা শুনি । মনটা খারাপ হয়ে যায় আমার  । প্রসঙ্গ মাশফি এবং স্যাম । মাশফি এবং স্যামকে নিয়ে উপরের লেখাটি আমার ফেসবুকে প্রকাশিত হয় ।  এ প্রেক্ষিতে  কয়েকজন মা আমার সাথে কথা বলেন ।  একজন মা জানান, এ ধরণের উদ্ভাবক  সন্তানদের নিয়ে বাবা মাকে – বিশেষ করে মাকে অনেক বিড়ম্বনায়  পড়তে হয় । কারণ, এসব বিষয়ে  তাদের স্কুলের শিক্ষকদের কোন সহযোগিতা পাওয়া যায় না । তিনি জানান ডিজিটাল ডিভাইস এন্ড ইনভেশন এক্সপো- ২০১৯ এর মত একটা  আন্তর্জাতিক পর্যায়ের  মেলায়  অংশগ্রহনের জন্যও  মাশফি এবং স্যামের মত  প্রতিভাবান  ছাত্রদের ক্ষেত্রেও  তাদের শিক্ষকদের অনেক অনুনয়বিনয় করে রাজি করাতে হয় ।  এজন্য তাদের অভিভাবকদের-   বিশেষ করে মাদের অনেক  হেনস্থা হতে হয় ।  মেলায় অংশগ্রহন  সময়ে যদি  কোন  ক্লাস টেস্ট হয়ে থাকে, তাহলে সেই পরীক্ষায়  অংশ না নেওয়া বা  খারাপ  হওয়ার কারণে তাদের সন্তানদের  স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া  হয়; অনেক সময় বেরও করে দেওয়া হয় । উদ্ভাবক হিসেবে কোন প্রশংসা তো করা হয় না- অনেক ক্ষেত্রে কঠিন  তিরস্কার করা হয় । এ সব ক্ষেত্রে অনেক মাকে কান্নাকাটি করতে হয়; শিক্ষকদের হাতেপায়ে ধরে  তাঁদের সন্তানদের ছাত্রত্ব  টিকিয়ে রাখতে হয় । এ কারণে অনেক ছেলেমেয়ে  মাশফি এবং স্যামের পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই  ঝরে যায় । অর্থাৎ, কোন  ছাত্রছাত্রী সৃষ্টিশীল কোন কাজে সময় নষ্ট না করে,  কেবলমাত্র যেন ক্লাসের পড়া ঠিকমত করে- এটাই সব শিক্ষক চান । একটু এদিকওদিক হলেই  সেই ছাত্রছাত্রীর মাকে শিক্ষকদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় । এসব  বিড়ম্বনা থেকে বাঁচতে বাবা মায়েরা ছেলেমেয়েদের সৃষ্টিশীল  কাজকর্ম থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেন । আর  একজন  মা জানান,  ইনোভেশন মেলায়   স্যামকে  যখন   প্রশ্ন করা হয়,  সে সময় তিনি নিজে সেখানে উপস্থিত  ছিলেন  । সব প্রশ্নের জবাব স্যাম  সুন্দর ভাবে দেয় । কিন্তু,  তার উদ্ভাবনের কাজে কে তাকে উৎসাহ দিয়ে থাকে –    এ  প্রশ্নের   কোন জবাব দেয়নি সে ।  তখন তিনি নিজে   স্যামকে এ প্রশ্নের জবাবে তার মায়ের কথা বলার পরামর্শ দেন  । স্যাম  তখন  তাঁর  কানেকানে বলে,  রোবট নিয়ে কাজ করলে,  তার মা  তাকে বকা দেন  এবং  এসব করলে  স্কুলের  পরীক্ষায় ফেল করবে বলে ভয় দেখান । এখানে স্যামের মায়েরও  কোন দোষ নেই । কারণ, তাঁর ছেলের স্কুলের শিক্ষকদের  তাঁকেই সামলাতে হয় এবং সে বিড়ম্বনা তাঁর জানা আছে ।

শিক্ষকগন তাঁদের প্রকৃত  জিনিয়াস ছাত্রছাত্রীদের চিনতে  পারেন না বলে একটা অভিযোগ রয়েছে । এ অভিযোগ অতি প্রাচীনকাল থেকেই  চলমান । টমাস আলফা এডিশন এবং স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন এঁর মত জিনিয়াসদের জন্ম না হলে মানবসভ্যতা আজকের পর্যায়ে  আসত কি-না সন্দেহ । অথচ, এসব ক্ষণজন্মা  মানুষের ছেলেবেলায়  শিক্ষকগন শুধু যে তাঁদের গাধা বলেছেন তা নয়;  তাঁদের মাদের   নাকেরজল চোখেরজল এক করে ছেড়েছেন তাঁরা । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শিক্ষকগন যাঁদের অপদার্থ  বলেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরাই  মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে অবদান রেখেছেন সবচেয়ে  বেশী । তবে,  যুগের অনেক পরিবর্তন এসেছে । আমাদের দেশে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার থেকেই  ছেলেমেয়েদের উদ্ভাবনী ক্ষমতার উপর সবিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে । এ লক্ষ্যে প্রতিবছর দেশব্যাপী উন্নয়ন মেলাও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ।  আমাদের সম্মানিত শিক্ষকগন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই তাঁদের পুরানো বদনাম ঘুচিয়ে নিতে পারেন ।  

আমরা জানি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মুল চালিকাশক্তি হবে  নতুন প্রযুক্তি । নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তিবাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিতে হলে –  এই প্রযুক্তিঅবশ্যই দেশজ মাথা থেকে আসতে হবেএদেশের দেশপ্রেমিকপ্রতিভাবান তরুণতরুণী এবং  ডিজিটাল সন্তানদের মাথা থেকেই আসতে হবে ।  পূর্বের  সবকটি শিল্প বিপ্লবে  বাংলাদেশকে   শিল্পপন্যআমদানীকারক দেশ হিসেবে থাকতে হয়েছেযে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্লাটফরম ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছেইতিহাস সাক্ষী, এই প্রথমবারের মতবাংলাদেশ একটা শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে ।  এইসুযোগ কাজে লাগাতে হলে মাশফি এবং স্যামের মত  ডিজিটালসন্তানদের  সক্রিয় অংশগ্রহনের পরিবেশ দিতে হবে ।  আর  সম্মানিতশিক্ষকগণই পারেন এই সুযোগ সৃষ্টি করতে

শিক্ষকগন একটু আন্তরিক হলেই সংশ্লিষ্ট  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদ্ভাবনেরক্ষেত্রে প্রতিভাসম্পন্ন ছাত্রছাত্রীদের  আলাদা করতে পারেন ।  শুধুতথ্যপ্রযুক্তি নয়; খেলাধুলা, বিতর্কসহ  অন্যান্য  ক্ষেত্রে ধরণেরতালিকা হতে  পারেএসব ছাত্রছাত্রীদের জন্য  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরপ্রচলিত সাধারণ নিয়ম শিথিল করা যেতে পারেপ্রতিষ্ঠানেরপরিচালনা পর্ষদ এটা সহজেই করতে পারেনপ্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিভাগ/ মন্ত্রনালয় থেকেবিষয়ে প্রয়োজনীয় পরিপত্র জারি করা যেতেপারে । ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে জ্ঞানভিত্তিক উন্নত  একটি দেশে রুপান্তর করতে হলে-  এ ধরণের ব্যবস্থা নেওয়া আসলেই জরুরী ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*