সংসদে অর্থ মন্ত্রীর বাজেট পেশ ও প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্নঃ

ডা. এস এ মালেক, কলাম লেখক ও রাজনৈতিক

চ্যালেঞ্জ ও নুতন স্বপ্ন নিয়ে গত ১৩ জুন মহান জাতীয় সংসদে
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি ২০১৯-২০ অর্থ বছরের জন্য ৫ লক্ষ
২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন। এটা
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয় বারের ক্ষমতায় আসা
ও বর্তমান অর্থমন্ত্রীর পেশকৃত প্রথম বাজেট। বাজেট বলতে আমরা
সাধারণতঃ বুঝি সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব এক বছরের। একটা
গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ প্রদত্ত অর্থ সরকার কিভাবে ব্যয় করছে বা
কোন কোন উৎস থেকে কর আদায় হবে, তার হিসাব নেওয়ার অধিকার
জনগণের রয়েছে। একইভাবে সরকারের দায়-দায়িত্ব হচ্ছে কোন কোন
খাতে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা জনগণকে অবহিত করা। এখানেই বাজেটের
গুরুত্ব। স্বচ্ছতার ও জবাবদিহিতার প্রয়োজনে প্রতিবছর মহান জাতীয়
সংসদে জনগণ প্রদত্ত অর্থ আয়-ব্যয়ের হিসাব বাজেটের মাধ্যমে
উপস্থাপন হয়ে থাকে। বাজেট অধিবেশনেই জানা যায় কত অর্থ সরকারি
কোষাগরে জমা ও তা কিভাবে ব্যয় হচ্ছে। সংসদে জনপ্রতিনিধিদের
অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় বাজেট পাশ করা হয়। কোন খাতে কত অর্থ
বরাদ্দ হচ্ছে, কি কারণে তা ব্যয় হবে, তার হিসাব সংসদে সরকারকে দিতে
হয়। সাংসদরা ইচ্ছা করলেই ঐ বাজেটের পরিবর্তন, পরিমার্জন ও
সংযোজন প্রস্তাব করতে পারেন। তাই সংসদে প্রদত্ত বাজেট সংশোধিত
হওয়ার সুযোগ রযেছে। এই জন্য বাজেট অধিবেশন সাধারণতঃ দীর্ঘ
হয়। প্রতিটি বরাদ্দ নিয়ে আলোচনা হয়, প্রতিটি বিল মন্ত্রণালয়
ভিত্তিক পৃথকভাবে পাশ হয়। তাই বলে বাজেট শুধু বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের
হিসাব নয়। যে সরকার বাজেট প্রণয়ন করছেন, তার রাজনৈতিক
সদইচ্ছার উপর বাজেট বাস্তবায়ন নির্ভর করে। গণবিরোধী স্বৈরাচারি
সরকার যখন ক্ষমতায় থাকেন, তখন সংসদ সার্বভৌম থাকে না। এক ব্যক্তির
ইচ্ছা পূরণে সংসদকে ব্যবহার করা হয়। তাই স্বৈরাচারি সরকারের বাজেট
হয়ে থাকে একব্যক্তি কেন্দ্রিক। সরকার প্রধানের ইচ্ছাই বাজেট প্রণীত
হয়। তাই বাজেট পূর্বক আলোচনার পূর্বেই কি ধরনের সরকার রাষ্ট্র

পরিচালনা করছেন, তার উপর বাজেটের গতি প্রকৃতি নির্ভর করে।
উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৩ বছর জাতির জনক
বঙ্গবন্ধু দেশ শাসন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত
ভঙ্গুর অর্থনীতিকে কত কম সময়ে, কত ব্যাপকভাবে অগ্রসরমান করতে
সক্ষম হয়েছিলেন, তা তৎকালীন উন্নয়নের গতি ও প্রকৃতি দেখেই তা
অনুধাবন করা যায়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন অর্থ মন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন
আহমেদ মহান জাতীয় সংসদে ৮শ কোটি টাকার নিচে বাজেট পেশ
করেন। সেই স্বল্প আয়ের ও বিদেশ থেকে সাহায্য সহযোগিতা এনে
যেভাবে বঙ্গবন্ধু ৩ বছরের মধ্যেই শক্ত ভিত্তির উপর অর্থনীতিকে প্রতিষ্ঠিত
করেছিলেন, তা অকল্পনীয়। তারপরে এসেছে প্রতি বিপ্লবের
ধারাবাহিকতা। ‘‘৭৫-৯৬’’ এই দীর্ঘ একুশ বছরে দুইজন স্বৈরশাসক,
একজন তাদের অনুসারী বাংলাদেশ শাসন করেছেন। এই একুশ বছরে
আমরা দেখেছি খাল কাটা বিপ্লব, মানি ইজ নো প্রোবলেম, এই
ধারাই উন্নয়ন ও অগ্রগতি ধাবিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে কিছু
কিছু উন্নয়নও হয়েছে- যেমন সড়ক যোগাযোগ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের
উন্নয়ন। তবে এই একুশ বছরে যেভাবে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হওয়ার কথা
ছিল, সেভাবে কিন্তু হয় নাই। কারণ যারা এই সময়ে দেশ পরিচালনা
করেছেন, তারা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বপক্ষের সাধারন জনগণকে রাষ্ট্রীয়
কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারেন নি। যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা
স্বাধীনতা বিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে না। উন্নয়ন
তাদের বিবেচ্য বিষয় ছিলনা। কিভাবে ক্ষমতায় থাকা যায়, কিভাবে
বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতা সফল করা যায়, এটাই ছিল তাদের দেশ শাসনের
মূল লক্ষ্য। তাই দেখা যায় এই একুশ বছরে দেশের খাদ্য ঘাটতি, প্রবৃদ্ধি
৫% এর উপরে উঠে নি, মূদ্রাস্ফীতি দুই অংকে ছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য,
দারিদ্র বিমোচন প্রভৃতি জনকল্যাণমুখী খাতে কোন বিশেষ বরাদ্দ করা
হয় নি। শিক্ষার সুযোগ সীমিত মানুষের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। গ্রামে
স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ ছিল না। প্রতিবছর প্রায় ৩০-৪০ লক্ষ মেট্রিক
টন খাদ্য বিদেশ থেকে আমদানী করতে হতো। গ্রামে তেমন বিদ্যুৎ
পৌছে নি। স্কুল, কলেজের চিত্র ছিল দৈন্যদশা। প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়
করণ করা হয় নি। সার্বিক বিবেচনায় দেশের মানুষের অবস্থা ছিল অত্যন্ত
করুণ।

অথচ স্বৈরশাসনের সমর্থকরা অতি অল্প সময়ের মধ্যে শোষক শ্রেণী গড়ে
তুলতে সক্ষম হন। পাকিস্তানের তেইশ পরিবারের বিপরীতে ২৩শ পরিবারের
জন্ম হয়। টাকা কোন সমস্যাই নয়, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে
সুবিধাভোগীদের বিলি বন্টন করা হয়। সরকারি দলের সমর্থক, বিএনপি
ও জাতীয় পার্টি কর্মীরা অল্প সময়ে ধনশালী ও বিত্তশালী হয়ে যায়। এক
কথাই রাষ্ট্র জনগণের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধ না হওয়ায় তাদের দেশ পরিচালনায়
জনগনের কল্যাণ সাধিত হয় নি। ১৯৯৬ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর
কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশ
পরিচালনা সুযোগ পেয়ে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে পূর্বের দৃশ্যপটের
সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটান। সরকারের জনকল্যাণমুখী নীতি এবং সরকার
প্রধানের অকুণ্ঠ দেশপ্রেম এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তানের সুদীর্ঘ
অঙ্গিকার, মাত্র ৫ বছরে দেশের চেহারাই পাল্টে যায়। এমন কোন ক্ষেত্র নেই,
যেখানে উন্নয়ন ও অগ্রগতি হয়নি। মাঝে ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত মেয়াদে
এই ৭ বছর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ও সামরিক বাহিনী কর্তৃক
নিয়ন্ত্রিত তত্ত¡াবধায়ক সরকার দেশের অগ্রগতি আবার থামিয়ে দেয়।
সরকারের গণবিরোধী নীতির কারণে দেশ পশ্চাৎমুখী হয়ে পড়ে। ২০০৮
সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটে নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা
নিয়ে পূর্ণরায় শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে ২০১৯ এই ১১ বছর একটানা
ক্ষমতায় থেকে সেই ১৯৯৬ সালের কর্মসূচি নেন, তা সম্পূর্ণ করে
দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে দেশ ও জাতিকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যান। এই ১১
বছরের দেশের উন্নয়নের গতি প্রকৃতি যেভাবে অগ্রসরমান হয়েছে,
তা শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, পৃথিবীর অন্য দেশের জন্য শিক্ষনীয়। আমরা
ইতিমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছি। ২০৪১ সালের মধ্যে
উন্নত সমৃদ্ধ দেশের পর্যায়ে পৌছে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। দেশ
এখন উন্নয়নের রোল মডেল। ১০ বছর আগে জাতীয় সংসদে যে বাজেট
পেশ করা হয়েছিল, তার আকার ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। আর এখন
তা বেড়ে হয়েছে ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। সেই সময়ে দেশের
৩০-৪০ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য আমদানী করতে হতো। আজ আমরা ১০-১৫ লক্ষ
টন খাদ্য রাপ্তানী করতে স্বক্ষম হয়েছি। মাথা পিছু আয় ৫৭৫ মার্কিন
ডলার থেকে বেড়ে ১৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশে
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে সরকারি করণ করা হয়েছে।

বছরের শুরুতেই ৩৫ কোটি বই বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ
করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া কেন, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশও এই কাজটি
করতে সক্ষম নয়। এবার প্রবৃদ্ধি ৮.২৫% ধরা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর
বিশ^াস আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকলে এবং
উন্নয়নের এই গতি ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালের মধ্যে আমাদের
প্রবৃদ্ধি ২ ডিজিটে উন্নীত করা সম্ভব হবে। এবার মূদ্রষ্ফীতি
সুনিয়ন্ত্রিত ৫.৫%। আমাদের বৈদেশিক মূদ্রার রিজাভ ৩৩ বিলিয়ন
মার্কিন ডলার। গ্রাম বাংলার প্রতিটি পল্লীতে স্বাস্থ্যসেবা পৌছে
গেছে। বর্তমান বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রতিটি ঘরে
বিদ্যুৎ পৌছে যাবে। ১১ বছরে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট থেকে
উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ২১ হাজার মেগাওয়াটে পৌছেচে। সেদিন আর
বেশি দূরে নয়, ঢাকার মানুষ মেট্রোরেলে চলাফেরা করবে। কর্ণফুলী
ট্যানেলে গাড়ি চালিয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম মাত্র ৩ ঘন্টায় যাতায়াত করতে
পারবে। বহুল প্রতিক্ষিত পদ্মা সেতু দ্রæত বাস্তবায়নের দিকে। এই সেতু
নির্মিত হলে মাত্র ৫মিনিটে পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সম্ভব হবে। পারমানবিক
বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশে
এক সময় আন্তর্জাতিক সমূদ্রবন্দর ছিল চট্টগ্রাম। এখন ৩টি
আন্তর্জাতিক মানের বন্দর নির্মাণের কাজ শেষের পথে। এর সবকিছু
ঘটেছে শেখ হাসিনার মতো একজন যোগ্য,প্রাজ্ঞ, বিচক্ষণ,
দেশপ্রেমিক, কঠোর পরিশ্রমি, লোভ লালসাহীন, সুযোগ্য ও দক্ষ
প্রধানমন্ত্রীর কারণে। দিনরাত তিনি নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
ছুটে চলেছেন বিশে^র একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। জনগণের কল্যাণে
নিয়োজিত এই শ্রদ্ধেয় নেত্রী মহান জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ
করেছেন। অনেকেই বলেছেন এটা অনিয়মতান্ত্রিক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে
কেবিনেট ব্যবস্থায় যে কোন মন্ত্রীর অসুস্থ্যতা জনিত কারণে
প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিতে পারেন। অর্থমন্ত্রী অসুস্থতায় প্রধানমন্ত্রীর
ভাষন ঐকান্তই বিধি সম্মতবটে। এটাকে বাকা চোখে দেখার কোন
সুযোগ নেই। বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন,
এবারের বাজেট জনকল্যাণমুখী। জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক
ঘোষিত বাজেট অবশ্যই জনকল্যাণমুখী হবে। তিনি বলেছেন তার চাওয়া
পাওয়ার কিছু নেই। জনগণের কল্যাণেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ

করেছেন। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই তার রাজনীতির মূল্য লক্ষ। তিনি
চান সমাজের শোষিত বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের মুক্তি। অবশ্য এ কথা
ঠিক যে পদ্ধতিতে সরকার চলছে, সেই পদ্ধতিতে শোষিত বঞ্চিত মানুষের
কল্যাণ করা একটা কঠিন প্রক্রিয়া। কিন্তু শেখ হাসিনার জন্য কোন
কিছুই করা কি অসম্ভব। বিশ^ রাজনীতি আজ কোন অবস্থায় বিদ্যমান।
দক্ষিণ এশিয়ার বাসস্তবতাটা কি। পারিপাশির্^কতা ও বাস্তবতাকে
অস্বীকার করে যারা নতুন ধারার প্রবর্তনের মাধ্যমে বিকল্পভাবে
বাংলাদেশকে পরিচালনার কথা বলেন মনে হয় তারা পরিবর্তিত বিশ^
ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন না। ৬০-৭০ বছরের পুরানা অভিজ্ঞতা
তাদের হৃদয়কে এমনভাবে আলোড়িত করেন যেন তারা ২০১৯ সালে এসেও
একই মতাদর্শ ও ভাবাদর্শে চলতে চান। যে বিশ^ ব্যবস্থা তাসের ঘরের
মতো ভেঙ্গে পড়েছিল, তাকে পুনরুজ্জিবিত করার স্বপ্ন কল্পনা বিলাসী
নয় কি। বাস্তববাদী, প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শি নেতৃত্বের কারণে শেখ হাসিনা
এসব কথা বিবেচনা নিয়েই দেশ পরিচালনা করছেন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা
আজ সচল। বিশ^ আর্থসামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে মিল রেখে চলতে হলে
বাংলাদেশ এ ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই। তবে শোষণম্ধুসঢ়;ক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও
বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের যে স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছিলেন, শেখ
হাসিনাও কিন্তু তার থেকে একচুল নড়েননি। জনগণের জন্য তিনি যা
করছেন তা সর্বজনবিদিত। কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ, তথ্য প্রযুুক্তি,
স্বাস্থ্যখাত, দারিদ্র বিমোচন, নারী ক্ষমতায়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব
সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এই সাফল্যের সুফল এদেশের সাধারণ মানুষ,
শ্রমজীবী মানুষ ভোগ করছেন। গার্মেন্টস শিল্পে কিছু কিছু
সমস্যা থাকলেও তা সমাধানের পর্যায়ের রয়েছে। তবে এ কথা ঠিক
সুনির্দিষ্ট শ্রমিক শ্রেণী, সমাজের দুর্বল জনগণের জন্য সরকার
নিরাপত্তা বলয়ই তৈরি করে অনুদান ও আর্থিক সাহার্য দিচ্ছে। একজন
বেকার মুক্তিযোদ্ধা এখন থেকে ১২ হাজার টাকা সম্মানি পাবেন। ১৬ লক্ষ
মানুষকে নতুনভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় এনে ৭৪ লক্ষ
কোটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বয়ষ্ক ভাতা, বৃদ্ধভাতা, স্বামী পরিত্যক্ত ভাতা,
গর্ভকালীন ভাতা, পেনশন ভাতা ইত্যাদি বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের
জন্য সরকারি গৃহিত কর্মসূচি প্রসংসার দাবী রাখে। এমন কোন
গ্রাম নেই যেখানে অন্ততঃ ৪/৫জন মানুষ এই ধরণের ভাতা পাচ্ছেন না।

কেউ কি কখনো চিন্তা করেছেন, বৃদ্ধ মানুষ এ ধরণের ভাতা পাবেন।
বৃদ্ধদের সন্তান সাহায্য না করলেও শেখ হাসিনার সরকার কিন্তু তাদের পাশে
আছেন। আমি গ্রামে এক বৃদ্ধকে বলতে শুনেছি সরকারি ভাতা পেয়ে
কপালে ছুঁেয় বলেছেন, শেখ হাসিনার ভাতা। তার পরেও বলতে হবে সব
লোক কি সুখে-শান্তিতে আছে। নদী ভাঙ্গন, ঘুর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত
মানুষ, জোয়ারে ভেসে যাওয়া সর্বশান্ত মানুষ, শহরে বস্তি স্থাপন করে
বসবাস করছে। এখনও কয়েক লক্ষ শিশু, বাসাবাড়ী কর্মচারীরা সঠিক
বেতন ও সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তবে এসব মানুষের উন্নয়নে
সরকার কাজ করে যাচ্ছে। শেখ হাসিনা একটা কথা প্রায়ই বলেন,
লেখাপড়া শিখে ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে চাকুরী পেতে হবে, এটা
কর্মসংস্থান নয়, কর্মস্ধসঢ়;ংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে সকল শিক্ষিত মানুষ
আত্মকর্মসংস্থান ও উৎপাদন মুখী কর্মে নিয়োজিত হলেই বেকারত্ব
দূরীকরণ সম্ভব। বেকার যুবকদের জন্য এবার বাজেটে ১০০শ কোটি
টাকা রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে বিনা জামানতে এই অর্থ সংগ্রহ
করা যাবে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের
সুযোগ সৃষ্টির লক্ষে ১০০টি শিল্পনগরী গড়ে তোলার প্রকল্প বাস্তবায়িত
হচ্ছে। ব্যাংকের সুদের হার এক অংকে আনা হচ্ছে। বেসরাকারি
বিনিয়োগকে উৎসাহি করা ও বিদেশী বিনিয়োগ দেশে এনে
বেকারাত্ব দূরকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি উদার নীতির কারণে
২০১৮ সালে ৩.৭ বিলিয়ন বিনিয়োগ এসেছে। সুতরাং কর্মসংস্থানের
সুযোগ বাড়তেই থাকবে। অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া প্রকৃত
উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এবারের বাজেটে যোগাযোগ ক্ষেত্রে সরকার
সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন। আমরা সড়ক পথ, নদী পথ, আকাশে
উদীয়মান বিমান বহর, প্রভৃতির দিকে তাকালে সর্বত্র উন্নয়নের দৃশ্য
দেখতে পারি। রাজশাহীতে ৪ ঘন্টায়, বিশেষ ট্রেনে, পঞ্চগড়েও দ্রæতগামী
বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে অল্প সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। সারা দেশে
সড়ক ও রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
চারিদিকে উন্নয়ন ও অগ্রগতি, পদ্মা সেতুর ২ কিলোমিটার আজ
দৃশ্যমান। যথাসময়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ না হলেও
দ্রæতগতিতে এগিয়ে চলেছে। আমার বাড়ী দক্ষিণবঙ্গে। আমি বেঁচে
থাকলে আমার বাড়ী পৌছাতে ৭ ঘন্টার পথ ৩ ঘন্টায় পৌছে যাবো। সব

সময় যখন ভাবি, ৭৫ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে
পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে দায়িত্ব দিয়ে দেশকে রক্ষা করেছি।
আমরা এদেশে যখন শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেই, তখন
আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই বিরোধীতা করেছেন। বিরোধীতা
করেছেন এই কারণে পারিবারিক শাসন প্রবর্তিত হবে, এই ধারণা
থেকে। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে। জননেত্রী শেখ হাসিনা
জাতির প্রত্যশা পূরণে বহুগুনে সক্ষম হয়েছেন। তিনি আগামীতে
নেতৃত্বে থাকলে আরও অবদান রাখবেন। বাজেট নিয়ে অনেক
প্রতিক্রিয়া আসছে। বিএনপি বর্তমান বাজেটকে গতানুগতিক বলে
বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাদের জোটের আহŸায়ক এককালীন
প্রবীন আওয়ামী লীগ নেতা ড. কামাল হোসেন বাজেট পরবর্তী
সম্মেলনে বাজেটের উপর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার চেয়ে শেখ হাসিনার
সরকারকে পতন ঘটানোর জন্যই বেশি তৎপর রয়েছেন। আমি ড. কামাল
হোসেনের নিকট বলছি, আপনি বাজেট নিয়ে কথা বলেছেন, আবার
শেখ হাসিনার পতনও চাচ্ছেন। একবার ভেবে দেখুন তো শেখ হাসিনা
ক্ষমতাসীন না থাকলে দেশ কোন পর্যায়ে যাবে। আপনি যদি
প্রধানমন্ত্রীর পদও পান, আপনি দেশকে মহা দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা
করতে পারবেন না। আপনি ঐক্যফ্রন্টের নেতা। আপনার নেতৃত্বে
নির্বাচন হলো। আপনার নেতৃত্বে ডিসেম্বরে সরকার পরিবর্তন
চাচ্ছেন। আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন, যাদের নেতৃত্বে আপনি
প্রতিষ্ঠিত, তাদের কেউ কি আপনার নেতৃত্ব মানেন। বিরোধী দলের
বাজেট সমালোচনা যে এক সময়ে নিরর্থক হবে, তা এ কথা সত্য। তবে
বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, রাজনৈতিক
বৃন্দ এই বাজেট সমালোচনা করেছেন তা ধরে নিয়েই মনে হয়
সমালোচনার কিছু ক্ষেত্র রয়েছে। কিছু অসংগতি ও ভুলত্রæটি থাকলে
সংসদে তা আলোচনার মাধ্যমে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু
প্রত্যাখান করার কোন সুযোগ নেই। আপনারা রাজনৈতিক কারণে
মিথ্যাচার করছেন। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় জাতীয় সংসদে ২০১৯-
২০ সালের অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট অবশ্যই বাস্তব সম্মত,
জনকল্যাণমূখী ও সঠিক। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে
প্রস্তাবিত বাজেট যুযোপযোগি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়া

স্বাভাবিক। ঘাটতি বাজেট অর্থ এই নয় যে, উন্নয়ন ও অগ্রগতি
ব্যাহত হবে। বরং অর্থনৈতিক অঙ্গিকার ও প্রত্যাশা যদি সীমাহীন না
হয়, তাহলে উন্নয়ন ও অগ্রগতি থুমকে থাকবে না। সীমিত আঙ্খংখা
থাকলে সমতা আনা সম্ভব। যারা বলেছেন বাজেট কল্পনা বিলাসী, ৩শ ৭৭
লক্ষ ৮১০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করা অসম্ভব, ১শ ৪৫ লক্ষ ৩৮০ কোটি
টাকার ঘাটতি কিভাবে পূরণ হবে। ্ধসঢ়;অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
বলছেন, জনবল বৃদ্ধি করলে ও কর ব্যবস্থাপনা গতিশীল ও সম্প্রসারণ করা হলে
এই লক্ষ পূরণ সম্ভব। তার পরও শেষ মেশ যদি প্রয়োজন পড়ে প্রতিবছরের
ন্যায় সম্পূরক বাজেট প্রনয়ন করে ও বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য, সঞ্চয়পত্র
এবং ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণের সুযোগ রয়েছে।
অনেকেই বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়াকে সমর্থন
করছেন না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেছেন বিপুল অংকের কালো
টাকা বিদেশে পাচার রোধেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কালো টাকার দৌরাতেœ সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হয়। ঐ কালো
টাকা বিনিয়োগের সুযোগ পেলে কিছুটা হলেও অপরাধ কমে আসবে।
সুনির্দিষ্ট পরিমান ১০% হারে সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে বাকী
টাকা শিল্পখাতে বিনিয়োগের জন্য সরকার উৎসাহ দিচ্ছেন। যেখানে
বিনিয়োগের জন্য পুঁজির অভাব, বিশেষ করে পুঁিজর অভাবে
বেসরকারিভাবে নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে
না, এই ক্ষেত্রে সরকারের এই সিদ্ধান্ত সঠিক।
যারা এই বাজেট কল্পনা বিলাসী, অবাস্তবায়নযোগ্য ও রাজস্ব আহরণ
অসম্ভব বলছেন তারা প্রতিবছরই একই উক্তি উচ্ছারণ করেন। কিন্তু সরকার
প্রমাণ করেছেন বাজেট ১০০% বাস্তবায়িত না হলেও ৯৫% সফলতা
অর্জিত হয়েছে এবং আগামীতেও হবে। তাই বলতে হয় বাজেট
জনকল্যাণমুখী। আগামী ৫টি বছর ক্রমাগতভাবে বর্ধিত আকারে
বাস্তবায়িত হলে মধ্যম আয়ের দেশে (ইতিপূর্বে উন্নীত হয়েছে)
উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত হওয়া অবশ্যই সম্ভব হবে। এই ক্ষুদ্র পরিসরে
সার্বিকভাবে বাজেট বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। আর বাজেটের সঠিক
সমালোচনা করবার যোগ্যতা ও আমারও আছে বলে মনে করি না। তাই
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছি। যারা

প্রস্তাবিত বাজেটের সমালোচনা করছেন তারা দেশের শত্রæ নয়, এমনকি
প্রতিপক্ষ নয়। প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও বিশ^াস
থেকেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। সরকারের উচিত সব কিছু বিচার
বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত প্রজ্ঞা, দুরদর্শিতা ও দক্ষতার সাথে জাতীয় সমস্যার
প্রতি দৃষ্টি দিয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এবং বঙ্গবন্ধুর
স্বপ্ন সোনার বাংলা বিনির্মাণে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বাজেট
জন আকাংখা পূরণে সফল হবে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার
বাস্তবায়িত হবে, সেই প্রত্যাশা রেখে লেখা শেষ করছি। মাননীয়
অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন ‘স্মার্ট’ বাজেট সংসদে পেশ করার জন্য ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*