জয় দিয়েই শুরু হোক বিশ্বকাপ

বিডিনিউজ প্রতিদিনঃ বার্ধক্য অনেক আগেই ছুঁয়েছে তাকে, তবে ১৬৪ বছরের বৃদ্ধ ঘড়িটিকে এখনও দম দিয়ে চালু রাখা হয়েছে। জমিদারবাড়ির মতো দেখতে ওভাল স্টেডিয়ামের সামনেই প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেল বাজিয়ে চলেছে সে। আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের ধারক হয়ে এই মাঠের বৃদ্ধ বটগাছ যেন এই ঘড়িটি। স্থানীয়দের বিশ্বাস, গির্জার ঘণ্টার মতোই পবিত্র মাঠের এই ঘড়িটি। এই ধ্বনি শুনে মাঠে নামাটা নাকি শুভ! তা দক্ষিণ লন্ডনের এই ঐতিহাসিক ভেন্যুতেই আজ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শুভ কাজে নামতে যাচ্ছে টাইগাররা। তবে বিশ্বকাপ যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে নয়; বরং প্রচণ্ড শান্ত ও কৌশলী হয়েই প্রোটিয়াদের মুখোমুখি হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। জানিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকা যদি ধরেই নিয়ে থাকে তাদের দুই পয়েন্ট নিশ্চিত, তাহলে জেনে রাখবেন আগেই হেরে গেছে তারা! কেননা প্রোটিয়া পেসারদের সামনে পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত তার ব্যাটসম্যানরা। রান দেওয়ার লাগাম টানতেও তৈরি তার বোলাররা। এখন অপেক্ষা কেবলই সম্মুখ লড়াইয়ের।

প্রচণ্ড একটা আত্মবিশ্বাসের ছাপ এ মুহূর্তে টাইগারদের চোখেমুখে। হয়তো তামিমকে গতকাল নেটে দেখেই উজ্জীবিত বাকিরা। কেননা তামিমকে দিয়েই শুরুর কৌশল কাজে লাগানোর পরিকল্পনা ঠিক হয়েছে টিম হোটেলে। আগের রাতে এক্স-রে রিপোর্ট পাওয়ার আগে পর্যন্ত খানিকটা দুশ্চিন্তা ছিল তামিমের। তবে সেখানে যখন দেখা গেছে, কবজিতে কোচ চিড় বা ভাঙন ধরেনি তখনই টিম ম্যানেজমেন্টকে জানিয়ে দেন প্রথম ম্যাচে ওপেন করতে নামছেন তিনি। ফোলাটা একটু কমলেও ব্যথা রয়েছে এখনও- তার পরও তামিম বলে দিয়েছেন, প্রয়োজনে পেইন কিলার নিয়েই প্যাড পরবেন। তামিম খেলতে পারলেও পেস অলরাউন্ডার সাইফউদ্দিন আজ হয়তো নামতে পারছেন না। যে কারণে একাদশে রুবেল হোসেনের থাকাটা প্রায় নিশ্চিত। সেই সঙ্গে মোসাদ্দেক সৌকত নন, অভিজ্ঞতার কারণে সাব্বিরও এগিয়ে থাকছেন। মাশরাফির আস্থার সেই একাদশ হতে পারে অনেকটাই এরকম- তামিম, সৌম্য, সাকিব, মুশফিক, মিঠুন, মাহমুদুল্লাহ, মিরাজ, সাব্বির, মাশরাফি, মুস্তাফিজ আর রুবেল।

ওভালে এর আগেও বাংলাদেশ তিনটি ম্যাচ খেলেছিল। একটি পরিত্যক্ত বাকি দুটিতে হার। তবে পুরনো খাতার এই হিসাবটি অন্যভাবে সতীর্থদের কাছে তুলে ধরেছেন কোচ স্টিভ রোডস। মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই মাঠে দু’বছর আগে গত চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেই ৩০৫ রান তুলেছিল বাংলাদেশ। তামিম সেই ম্যাচে ১২৮ রান তুললেও ম্যাচটি ইংলিশদের কাছে হারতে হয়েছিল ৮ উইকেটে! সেদিন থেকেই ওভালের একটি সুপ্ত ব্যাপার লক্ষ্য করেছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। আর তা হলো গোলাকার এই মাঠের কিছুদিকের বাউন্ডারি লাইন বেশ ছোট। এ নিয়ে দু’দিন আগে তিনি দলের কম্পিউটার অ্যানালিস্ট শ্রীর সঙ্গে বসেছিলেন। জেনে নিয়েছেন, একদিকে লংঅন আর লংঅফের দূরত্ব মাত্র ৬৭ মিটার, অন্যদিকটা ৭০ মিটার। মিড উইকেটেও কাছাকাছি একটি জায়গায় ৬৮ মিটার। ওভালের জ্যামিতি শেষ করার পর প্রোটিয়াদের ‘পাটিগণিত’ও করে নিয়েছেন টাইগার অধিনায়ক! হ্যাঁ, ব্যাপারটি অনেকটা তেমনই।

আজ যদি ডেইল স্টেইন না খেলতে পারেন তাহলে প্রোটিয়াদের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার থাকবেন রাবাদা। এনগিডি আর ফেলুকাওয়েও বাউন্সার দেওয়ার চেষ্টা করবেন নতুন বলে। তাদের জন্য সৌম্যকে প্রস্তুত রেখেছেন মাশরাফি। ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে বোলাররা পাকিস্তানকে ১০৫ রানে অলআউট করে দিয়েছিলেন, সেই একই বোলাররা আমাদের সঙ্গে আয়ারল্যান্ড সিরিজেও খেলেছে। ওখানেও কিন্তু ওরা আমাদের ব্যাটসম্যানদের বাউন্সার আর শর্ট বল দিয়ে পরীক্ষায় ফেলেছিল। আমাদের ব্যাটসম্যানরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তাই প্রোটিয়া পেসাররাও যে তেমনটা করবে, সেটা ধরেই নিয়েই আমরা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।’ তবে এদিন ওভালের পিচের কাছে গিয়ে অভিজ্ঞতার চোখ দিয়ে দেখা মাশরাফির ধারণা, আজকের ম্যাচে স্পিনাররা বেশি সুবিধা পেতে পারেন। সেই কারণে ইমরান তাহিরের সঙ্গে আজ শামসিকেও খেলাতে পারে প্রোটিয়ারা। এমনও হতে পারে, প্রথম ম্যাচের মতো শুরুতেই সৌম্যকে তাহিরের লেগ স্পিনের পরীক্ষা দিতে হতে পারে। সম্ভাব্য সব আক্রমণ মোকাবেলা করার জন্যই প্রস্তুতি সেড়ে রেখেছে টাইগাররা। প্রতিপক্ষের ব্যাটিং লাইনআপে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মনে করা হচ্ছে হাশিম আমলাকে। যদি আমলা কোনো জুটি বাঁধতে না পারেন তাহলে ডু প্লেসিস আর ডুমিনিকে দিয়ে মিডল অর্ডার খুব বেশি হয়তো সুবিধা করতে পারবে না। তার ওপর প্রথম ম্যাচ ইংল্যান্ডের কাছে হেরে একটা মানসিক চাপেও রয়েছে প্রোটিয়ারা- দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসা সাংবাদিকরা অন্তত সেটাই মনে করছেন। যদিও মাশরাফি তা উড়িয়ে দিয়েছেন। ‘ইংল্যান্ডের সঙ্গে প্রোটিয়ারা যে প্ল্যান নিয়ে নেমেছিল, তা যে আমাদের সঙ্গেও একই থাকবে তার কোনো গ্যারান্টি নেই।’

গ্যারান্টি দেননি মাশরাফি জয়ের ব্যাপারেও। আকাশকুসুমের বাইরে একটি বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। ‘দেখুন, এই বিশ্বকাপে অনেকেই আমাদের চ্যাম্পিয়ন, কেউ বা সেমিফাইনালে উঠিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দলেও কেউ কেউ এমনটা ভাবছে। এটা একদিক থেকে ভালো, তবে প্রত্যাশা যেন চাপ না হয়ে যায়। সেটাই দেখতে হবে। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা কেউ কিন্তু আমাদের ফেভারিট বলছেন না। আমরাও সেটা মনে করছি না। আমাদের বিপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকাই এগিয়ে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা হাল ছেড়ে দেব।’ হয়তো সে ম্যাচটির কথা মনে আছে মাশরাফির। ২০০৭ বিশ্বকাপে গায়নায় এরচেয়েও শক্তিশালী দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে দিয়েছিল একঝাঁক টসবগে রক্তগরম করা তরুণের দল। ২০ ম্যাচের মধ্যে মাত্র তিনটিতে জয় দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। যার দুটোই এসেছিল ২০১৫ সালে মিরপুরের মাঠে। তাই প্রোটিয়া ফায়ার নেভানো টাইগারদের জন্য নতুন কিছু নয়। মাঝের চার বছর বন্ধ হয়ে থাকা জয়ের চাকাটিকে এবার শুধু দম দিতে হবে ওভালের ওই বুড়ো ঘড়িটার মতো! সূত্রঃ সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*