সাকুরা মৌসুমে

রাশেদুল ইসলাম,

রাস্তার দুপাশে চেরি গাছ । ফুলে ফুলে ভরা । একটিও পাতা নেই গাছে । কিন্তু বিচিত্র রঙের চেরি
ফুলে ভরা । গাইড ইউমি বলেন, ‘এত আগে চেরি ফুল ফোটে না । তোমরা এসেছ; তাই ফুটেছে । তোমরা
ভাগ্যবান’। এখানকার সকলেই পেশা সচেতন । নিজের কাজ শতভাগ দায়িত্বের সাথে করেন তারা ।
হিরোসী ইউমিকো একজন পেশাদার গাইড । তিনিও জানেন একজন পর্যটক কোন কথায় খুশী হন ।
চেরি ফুলের জাপানি নাম সাকুরা । ‘সা’ অর্থ পর্বত দেবতা । ‘কুরা’ অর্থ সমতল । বছরের এ সময়
পর্বত দেবতা নিচে নেমে আসেন । দেবতা নেমে আসার লক্ষণ প্রকাশ পায় সাকুরা ফুল ফোঁটার
মাধ্যমে । সারা বছর ফুলে ফসলে ভরে ওঠার পূর্ব লক্ষণ এটা । তাই এ সময় জাপানিদের শ্রেষ্ঠ
সময় । নানা উৎসবে মেতে ওঠেন তারা । আর, এসব উৎসবে যে খানাপিনা হয়; স্বয়ং পর্বত দেবতা
সেই খাবারে অংশ নেন । এমন একটি মাহেন্দ্র ক্ষণে আমি টোকিওতে । ২০১৯ সনের ২৪ মার্চ
বিকাল থেকে আমি এখানে । তাই আমি ভাগ্যবান তো বটেই । কিন্তু, আমার ভাগ্যবান হওয়ার
প্রেক্ষিত ভিন্ন । আমি বাংলাদেশের মানুষ । এখন প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ ।
সরকারের রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল
পরিবর্তন হয়েছে সত্য; কিন্তু, জাপান সফরের সামর্থ্য আছে ক’জনের ? আমার নিজেরও সেই
আর্থিক সামর্থ্য নেই । তবে, সরকারের উন্নয়নমুখী নীতিমালার কারণে বর্তমানে দেশের
আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা অনেক বেড়েছে । প্রায় সকল দপ্তরের কর্মকর্তাদেরই দাপ্তরিক
প্রয়োজনে বিদেশে আসতে হয় এখন । আর, যারা আসেন তাঁরা তো সৌভাগ্যবানই বটে ।
আমি এসেছি একটা শিক্ষা সফরে । তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সফলতা
অর্জন করেছে সত্য; কিন্তু, এই সফলতা ধরে রাখতে এবং একই গতিতে এগিয়ে নিতে অনেক
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তাকে । এই চ্যালেঞ্জ বোঝাতে অতীতের কিছু প্রেক্ষাপট বলা
দরকার । আমরা জানি পৃথিবী এখন তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে । প্রথম শিল্প বিপ্লব ঘটে
১৭৬৩ সনের পর – যখন স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন শিল্পপণ্য উৎপাদনে
ব্যবহার শুরু হয় । অর্থাৎ, যখন ইঞ্জিন দিয়ে মেশিন চালিয়ে শিল্পপণ্য উৎপাদন শুরু হয়; তখনই
প্রথম শিল্প বিপ্লবের শুরু । সকলেরই জানা ততদিনে পলাশীর যুদ্ধ শেষ হয়েছে । পরাজিত হয়েছেন
বাংলার স্বাধীন নবাব । ভারত উপমহাদেশের বাজার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দখলে নিয়েছে । ঢাকার
মসলিন কারিগরদের বুড়ো আঙুল কেটে দিয়ে মসলিন উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে । কাপড়ের সব বাজার
ইংরেজের দখলে । চীনের বাজারও দখল করেছে তারা । বলা যায় প্রথম শিল্প বিপ্লব ইংরেজদের
পৃথিবীর একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দেয় । দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব শুরু ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল
ফ্যারাডের বিদ্যুৎ দিয়ে । ১৮৭০ সালে যখন বিদ্যুৎশক্তি শিল্পপন্য উৎপাদনে ব্যবহার শুরু হয়;

তখনই ঘটে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব । ইতিমধ্যে আমেরিকা দাঁড়িয়ে গেছে । ইউরোপের অন্যান্য দেশের
প্রতিযোগিতা বেড়েছে । বলা যায়, এই বাজার দখলের প্রতিযোগিতার কারণে ১৯১৪ সনে প্রথম এবং
১৯৩৯ সনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু । পরাধীন থাকায় প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব থেকে ভারত
উপমহাদেশ প্রত্যক্ষ কোন সুবিধা পায়নি । তবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভারতের মত স্বাধীনতাকামী
অনেক দেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তি তরান্বিত করেছে । যদিও বাংলাদেশ পাকিস্তানের সাথে
অন্তর্ভুক্তির কারণে সে সুযোগ পায়নি । কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট আবিস্কার হয় ৬০ এর দশকে ।
এই আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে তথ্যপ্রযুক্তির যুগ শুরু হলেও শিল্পপন্য উৎপাদনে এর ব্যবহার শুরু
১৯৭০ এর দিকে । অর্থাৎ, তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা ১৯৭০ সনে । বাংলাদেশ স্বাধীন হয় ১৯৭১
সনের ডিসেম্বরে । এসময় নিজের দেশকে উন্নত করার জন্যে কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ
নেওয়ার প্রথমবারের মত সুযোগ পায় বাংলাদেশ । দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
শিল্পবিপ্লবের ক্রমবিবর্তনের পবরতী ধারা ঠিকই অনুধাবন করেন । ফলশ্রুতিতে ১৯৭৩ সনেই
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়ন (ITU) এর সদস্যপদ লাভ করে । ১৯৭৫ সনে বেতবুনিয়া ভূ-
উপগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি । কিন্ত, একই বছরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে
হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এই কর্মকাণ্ডের পরিসমাপ্তি ঘটে । ফলে, আশির দশকের মাঝামাঝি যখন
সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও দক্ষিন কোরিয়া তৃতীয় শিল্প বিপ্লবকে কাজে লাগিয়ে এশিয়ার উদীয়মান
বাঘে পরিণত হয়; তখন বাংলাদেশ সে সুযোগ হাতছাড়া করে । প্রকৃত পক্ষে বাংলাদেশ তৃতীয় শিল্প
বিপ্লবে যোগ দেয় ২০০৯ সনে । আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার মাধ্যমে । বলা
যায় তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের শেষ ট্রেনের যাত্রী বাংলাদেশ । তারপরও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা,
কার্যকরী বাস্তবায়ন পদ্ধতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্ব, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত
অংশগ্রহণ- সবকিছু মিলিয়ে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবে স্বল্প সময়ে বাংলাদেশ অভাবনীয় সফলতা অর্জন
করেছে । আর, এই সফলতার মধ্যেই কিছু চ্যালেঞ্জের জন্ম । যেমনঃ ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নতির
সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে । সাইবার অপরাধ বেড়েছে । বিষয়টি সরকারেরও জানা ।
এবিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে । কিন্তু ডিজিটাল ব্যবস্থার দেশীয় কোন সীমানা নেই ।
একক কোন দেশের বিষয় নয় এটা । ডিজিটাল যোগাযোগ একটা বৈশ্বিক বিষয় । তাই এর এর জন্য
সম্মিলিত প্রয়াস চায় । পারস্পারিক অভিজ্ঞতা বিনিময় চায় । আর, এসব নিয়েই আমাদের শিক্ষা
সফর । আমাদের সাথে আছেন শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদল ।
আমি বোধহয় ট্র্যাকের বাইরে এসে গেছি । বলছিলাম চেরি ফুলের কথা । সাকুরা মৌসুমের কথা ।
সাকুরা মৌসুমে টোকিওর কথা । আমরা একটা বিলাসবহুল হোটেলে আছি । কিন্তু, বিলাসবহুল হোটেল
আমাকে টানে না । আমি ভোরে হোটেল ছেড়ে বাইরে আসি । । টোকিওর রাস্তায় চেরিফোঁটা গাছের তল
দিয়ে হাঁটি । এখন ভোরের তাপমাত্রা ৮/ ১০ ডিগ্রিতে নেমে আসে । আমাদের দেশের জন্য প্রচণ্ড শীত
। কিন্তু, আমার কাছে কেমন যেন আরামদায়ক মনে হয় । আমি সেই আরামদায়ক ঠাণ্ডায় ঝকঝকে
পরিচ্ছন্ন রাস্তা দিয়ে হাঁটি । মাথায় প্রশ্ন আসে এরা রাস্তাঘাট এমন পরিষ্কার রাখে কিভাবে ? আমি
দুবাই এর রাস্তায় হেঁটেছি । সেখানে সব সময় কেউ না কেউ রাস্তা পরিষ্কার করছে দেখা যায় । কিন্তু,
টোকিওর রাস্তায় পরিচ্ছন্নতা আছে; কিন্তু কোন পরিচ্ছন্নতা কর্মী নেই । আমি মনে মনে

পরিচ্ছন্নতা কর্মী খুঁজি । রাস্তার অপর পাশের পার্কে একজনকে কাজ করতে দেখি । আমি এগিয়ে যাই
সেই পার্কের দিকে । সেখানে একজনের চারিদিকে অনেকগুলো পাখি ঘিরে আছে দেখতে পাই । একটা
চেরি গাছের নিচে বসা তিনি । একমনে ব্যাগ থেকে খাবার বের করে পাখীদের দিচ্ছেন । কোন
পরিচ্ছন্নতা কর্মী নন তিনি । নাম অগাতা মুকিতো (উচ্চারণ ভুল হতে পারে) । ষাট ঊর্ধ্ব বয়স হবে ।
নিজের নাম বলেই চুপ হয়ে যান তিনি । এখানে যারা জাপানি ছাড়া অন্য ভাষা জানেন না, তাঁরা সাধারণত
বিদেশীদের এড়িয়ে চলেন । পারতপক্ষে তাঁরা কোন কথা বলতে চান না বলে আমার মনে হয়েছে ।
অগাতা মুকিতোর মত মানুষ আমার খুব প্রিয় । পরম শ্রদ্ধেয় । আমি নিজে সংসারী মানুষ । নিজের
পরিবার পরিজনের বাইরে আর কারো নিয়ে আমার মাথাব্যাথা নেই । পশুপাখি বা অন্য কোন প্রাণীর
খাবার প্রয়োজন আছে কিনা এগুলো আমার ভাবা হয়ে ওঠে না । অথচ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব । হাদিস
অনুসারে বিনা প্রয়োজনে কোন প্রাণী তো দূরের কথা, গাছের একটা পাতা ছেড়াও নিষেধ । এই হাদিসের
অন্য মানে- গাছপালাসহ সকল প্রাণীর দেখভাল করা মানুষের দায়িত্ব । অগাতা মুকিতোর মত মানুষেরা
সেই কাজটি করে থাকেন । তাইতো আজও পৃথিবী এত সুন্দর ! আমার মত সবাই হলে পৃথিবী এত সুন্দর
থাকতো না ।
জাপানিদের সময় জ্ঞান এবং সুশৃঙ্খল জীবন আমাকে মুগ্ধ করে । কোন অফিসে নির্ধারিত সময়ের দশ
মিনিট আগে গেলেও গাইড এদিকওদিক ঘোরাতে থাকেন । তারপর ঠিক দুএক মিনিট আগে রিসিভ করার
লোক পাওয়া যায় । কনফারেন্স রুমে বসলে যথাসময়ে একজন আমাদের আলোচ্য সূচীতে কি কি আছে
জানিয়ে দেন । সবার সামনে ছোট এক বোতল পানি দেয়া । নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কথাবার্তা শেষ ।
কোন চা- নাস্তার ব্যবস্থা নেই । সেদিন একটা অফিসে এ ধরণের একটা মিটিং শেষে গাইড জানালেন
অফিসের ওপর তলায় দুপুরের খাবার ব্যবস্থা আছে । প্যাকেট লান্স । সাথে এক বোতল পানি । এখানে
আমরা নিজেরাও পরিছন্নতার ব্যপারে সিরিয়াস । ওয়ান টাইম প্লেটে খেয়ে সাবধানে আবার খালি
বোতল, প্লেট পলিথিনে ভরে গাইডের আনা বড় পলিথিনে রেখে দিলাম । গাইড সেই গারবেজ ভরা
পলিথিন বাসে নিয়ে রওনা দিলেন । আমার কৌতূহল হয় । আমি কারণ জানতে চাই । তিনি জানান ওখানে
গারবেজ রাখার জায়গা নেই । আমার কৌতূহল আরও বাড়ে ।( চলবে )
৩০ মার্চ, ২০১৯ । নিউ ওতানি হোটেল, টোকিও ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*