স্বাধীনতার ঘোষণা ও জ্বাজুল্যমান মিথ্যাচার

ডা. এস এ মালেক, বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিষ্ট,
আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কিছু বলার বিবেক প্রশ্রয় দেয় না। মিথ্যাচার মিথ্যাচারী সত্যের সাথে সংঘাত চিরন্তন। সে সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া বাস্তবতার নিরীক্ষে নয়। তাই আজকের এই লেখা শুনতে শুনতে কান প্রায় বধির। কত ভাবে, কত কায়দায়, সুদীর্ঘ সময় ধরে খোড়াযুক্তি উপস্থাপন করে প্রমাণ করবার চেষ্টা হয়েছেÑ জিয়াই স্বাধীনতার ঘোষক, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। আর তাই যদি সত্য হয়, তাহলে তো জিয়াকেই স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ হিসাবে গণ্য করা হয়। আসলে বাস্তবতা কি? আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে কেউ ঘোষণা দিল আর শুরু হয়ে গেল; এরূপ ঘটনা কি? ওরা বলতে চান বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানী হানাদারের হাতে বন্দি হয়ে যান; আর বন্দি হওয়ার আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণা শোনেনি। তাই জিয়া কালুরঘাট থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। ওদের মতে ঘোষণা না দিয়ে আ’লীগ নেতারা পালিয়ে ভারতে চলে যায়। এরূপ একটা পরিস্থিতিতে জিয়া একটা নেতৃত্বের শূণ্যতার মাঝে জিয়াই কালুরঘাট থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। জিয়ার অপমৃত্যুর অনেক পরে এটা জামায়াত ও বিএনপির নববুদ্ধিজীবীদের নব আবিস্কার। একজন প্রবীণ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক অনেক চিন্তা-ভাবনা করে খড়-কূটো পুড়িয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী
করার জন্য এ অপকৌশল অবলম্বন করেন এবং প্রফেসর এমাজউদ্দিনের মতো বুদ্ধিজীবীরা গোগ্রাসে গিলে ফেলেন। তা না হলে প্রফেসর এমাজউদ্দিনের মতো বিচক্ষণ লোক কি করে বলেন, কালুরঘাটে জিয়ার ঘোষণা তিনি পূর্ব
দিগন্তে সূর্য ওঠার সাথে তুলনা করেছেন। বুদ্ধিজীবীরা যখন কোন রাজনৈতিক সমর্থনে কাজ করেন, তখন তারা বুদ্ধিজ্ঞান হারিয়ে যে ধরনের উলঙ্গ অপরাধ করেন; তা রাজনীতিবিদদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এমাজ উদ্দিন সাহেব ইতিহাস জানে না এমনটা নয়। তিনি ২৩ বছরের পূর্ব বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস নিশ্চয়ই জানেন। ভাষা আন্দোলন থেকে সব আন্দোলনই তার চোখের সামনেই হয়েছে। এমনটা নয় যে তিনি ৬ দফা আন্দোলন দেখেননি। দেখেননি ’৬৯ এর গণঅভ্যূত্থান, ’৭০ এর মহাবিজয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ মুজিবের একচ্ছত্র আধিপত্য, তিনি ভালো করেই জানেন। পাকিস্তান শেখ মুজিবকে ১ নম্বর শত্রæ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। নিশ্চয়ই তিনি ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছেন। অসহযোগ আন্দোলনের কর্মকান্ড তার কাছে অজানা নয়। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ব্যাপারটাও বুদ্ধিজীবী হিসাবে তিনি অবহিত ছিলেন।  তিনি এত জানেন,২৩ বছরের পূর্ব বাংলার আন্দোলন কার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। কে
পাকিস্তানের প্রতিপক্ষ হিসাবে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এটাও জানেন কিভাবে ’৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু একচ্ছত্রভাবে বিজয়ী হয়ে চরম সঙ্কটকালে স্বাধীনতার ঘোষণার একমাত্র অধিকারী ছিলেন। বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে জিয়া বা জাতীয়তাবাদী দলের কোন অস্তিত্ব ছিলো কি? তাই আমার কাছে মনে হয়, স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন, এটা বড় কথা নয়, ঘোষণা দেওয়ার রাজনৈতিক, আইনগত ও নীতিগত অধিকার কে অর্জন করেছিলেন ওটাই বড় কথা। এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ছাড়া আর কারও নাম উচ্চারণ করার সুযোগ নেই। তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি ও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, জাতির পিতা। ২৬ শে মার্চ জিয়া পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসাবে জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাসে যাত্রা শুরু করেন। তাকে সেদিন প্রতিরোধ করা না হলে তিনি তো হানাদার বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করতেন ও নিশ্চিতভাবে জীবন হারাতেন। যিনি ২৬ শে মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা
ঘোষণা করবার পরেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অনুপ্রাণিত হতে পারেননি বা মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আসেননি; তিনি কি করে স্বাধীনতার ঘোষক হতে পারে। কি অধিকার বলে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারতেন? প্রথমবার তো
তিনি নিজেকে সরকার ও সামরিক প্রধান হিসাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তারপরেই তাকে চাপের মুখে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হয়। তার দলের লোকেরা প্রথমবার স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বলেন কিন্তু পরবর্তীতে
তিনি তার ভুল সংশোধন করে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন তার দলের নেতারা সে সম্পর্কে নীরব কেন? ইতিহাসের বাস্তবতার সাথে এই লুকোচুরি কেন? তিনি যদি স্বাধীনতার ঘোষকই হবেন; তাহলে তিনি মুজিবনগর সরকারের কাছে গিয়ে ধর্ণা দিলেন কেন? ঐ সরকারের অধীনে চাকরি করতে গেলেন কেন? তার তো উচিত ছিলো ভারতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বলা; তিনিই স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন, তাকেই সহযোগীতা করা হোক।

এরূপটা করলে বা বললে হয় তাকে উন্মাদ বলে অভিহিত করা হতো অথবা বিপদজনক ভেবে জেলে রাখা হতো। তিনি ভালো করেই জানতেন তার ওজন কতটুকু। তিনি নিজেই পরবর্তীতে পত্রিকায় আর্টিক্যাল লিখেছেন যে, বঙ্গবন্ধুর আহŸানে সাড়া দিয়েই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অগ্রসর হন ও যুদ্ধ করেন। তাহলে তার দলের নেতারা কেন তাকে বঙ্গবন্ধুর বিকল্প হিসাবে দাঁড় করাতে চেষ্টা করছেন। এই জ্ঞানপাপীরা কি এতটুকু বুঝবার জ্ঞান হারিয়েছে যে, ইতিহাসের বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কোন অধিকার ছিলো না এবং তিনি তা দেন নি। ৭ই মার্চের ভাষণই প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং জাতির পিতা। এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলা বা বিতর্ক সৃষ্টির কোন সুযোগ নেই। বিএনপি-জামায়াত- শিবির যতই মিথ্যাচার ও অপপ্রচার করুক না কেন, তাদের সেই অপচেষ্টা াার কোনদিন সফল হবে না। তারা ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানাতে পারেনি, মিথ্যাচার করেছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে এবং বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করে জাতিকে ভুল মেসেজ দিয়েছিলেন। তাদের সেই চেষ্টা বর্থ্য হয়েছে। নতুন প্রজন্ম আজ স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারছে এবং বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের চিন্তা-চেতনায়, আদর্শে এবং কর্মে ও পথচলায় স্বমহীমায় আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*