বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

বঙ্গবন্ধু পরিষদের উদ্যোগে আজ ৮ই মার্চ ২০১৯, শুক্রবার সকাল ১০ ঘটিকায় জাতীয়
প্রেসক্লাব ভবনের কনফারেন্স লাউঞ্জ-৩, তৃতীয় তলা (আব্দুস সালাম হল) মিলনায়তনে
“বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ” উপলক্ষে ‘বাঙালির হৃদয় জুড়ে যাঁর
আসন তিনিই দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক ৭ই মার্চে স্বাধীনতার ভাষণ”- শীর্ষক
আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত
ছিলেন অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিক, সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, উপাচার্য, শের-ই-বাংলা কৃষি
বিশ্ববিদ্যালয়, মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক- বঙ্গবন্ধু
পরিষদ), অধ্যাপক ড. ডালেম চন্দ্র বর্মণ, উপাচার্য, আশা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড.

মোঃ আলাউদ্দিন, উপাচার্য, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক
আ ব ম ফারুক, সাবেক ডীন, ফার্মেসী অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. এ জে
এম শফিউল আলম ভুইয়া, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন বিভাগ, ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার গোস্বামী, চেয়ারম্যান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. আনোয়ারা বেগম, পিএসসি’র সাবেক সদস্য সহ
দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবীগণ, বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় ও মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
সভাপতিত্ব করেনÑ ডা. এস. এ. মালেক, সাধারণ সম্পাদক, বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও উপদেষ্টা মন্ডলীর
সদস্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধু পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা মতিউর রহমান লাল্টুর সঞ্চালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক
উপাচার্য ড. আরেফিন সিদ্দিক বলেন, জাতিসংঘের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন
ইউনেস্কোকে অভিনন্দন। মানব জাতির সভ্যতার উন্নতি ও আধুনিক ক্রমবিকাশের ধারায় যাদের
অবদান রয়েছে, সেই সকল মহৎপ্রাণ ব্যক্তিদের ইউনেস্কো তাদের কর্মের স্বীকৃতি প্রদান
করছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য দলিল
হিসেবে আজ স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘের এই সংস্থাটি বঙ্গবন্ধুকে প্রকৃতভাবে
মূল্যায়ন করেছেন। বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত এবং অধিকারবঞ্চিত মানুষের পক্ষে সোচ্চার
ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আজীবন বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা
ভেবেছিলেন এবং বাঙালি যাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে পারে এবং উন্নত-সমৃদ্ধ
জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উচুঁ করে দাঁড়াতে পারে, বঙ্গবন্ধু সেই দর্শনেই
বিশ্বাসী ছিলেন।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদী
নেতা ছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলন সংগ্রাম করতেন। কোন সময়ই
হঠকারীতার বশবর্তী হয়ে কোনো কাজ করতেন না। সব সময় ভেভে-চিন্তে কোন সময় কী
করণীয় সেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতেন। বঙ্গবন্ধু সব সময় বাঙালির মুক্তি ও কল্যাণের কথাই
ভাবতেন। একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে যখন পাকিস্তানী শাসকবর্গ ক্ষমতা
হস্তান্তর করলেন না এবং নানা ভাবে ষড়যন্ত্র, মিথ্যাচার এবং বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে দেয়া
হলো, তখনই বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ ভাষণের মাধ্যমে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। তিনি একপর্যায়ে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে পাকিস্তানী স্বৈরশাসকদের ক্ষমতার মসনদ কেঁপে ওঠে। বঙ্গবন্ধু
বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা ছিলেন না। তিনি সব সময় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার
সমাধান চেয়েছিলেন। পাকিস্তানী শাসকবর্গ বাঙালির ওপর হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে বঙ্গবন্ধু
পাকিস্তান সরকারের নিকট কয়েক দফা প্রস্তাব পেশ করেন। কিন্তু পাকিস্তানীরা সেই প্রস্তাব
প্রত্যাখান করে বাঙালিদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের
মাধ্যমে পাকিস্তানদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব এখানেই শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে,
তিনিই একমাত্র নেতা, একটি জাতিকে জাতিসত্ত¡ায় রূপান্তরিত করে একটি স্বাধীন
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ড. শফিউল আলম ভুইয়া বলেন, পাকিস্তানী শাসকবর্গের দীর্ঘ ২৩ বছর বাঙালির বিরুদ্ধে
শোষণ-বঞ্চণার ইতিহাস বাঙালিদের অন্যায়ভাবে হত্যার ইতিহাস ৭ই মার্চের ঘোষণায় দেওয়া
হয়েছে। কেন তিনি স্বাধীনতার ডাক দিলেন, পরিস্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু জনগণের
নেতা ছিলেন। তিনি বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিলেন পাকিস্তানী স্বৈরশাসকরা অত্যন্ত
সুপরিকল্পিত ও অন্যায়ভাবে বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু আন্দোলন সংগ্রামে
বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হতে চাননি বলেই সবসময় আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আজ বিশ্বের সবচেয়ে সেরা। ভাষণগুলোর মধ্যে অনন্য শ্রেষ্ঠ ভাষণ এই কারণেই যে
বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি তাদের আত্মপরিচয় ও ঠিকানা খুঁেজ পেয়েছে। এই
ভাষণ যুগে যুগে বিশ্বে গণমানুষের অনুপ্রেরণা যোগাবে।

ড. আনোয়ারা বেগম বলেন, ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের পিছনে বঙ্গমাতা বেগম
ফজিলাতুন্নেচ্ছা মুজিবের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। যখন চারদিক থেকে পরামর্শ
আসছিল বঙ্গবন্ধু এই ভাষণের মাধ্যমে জনগণের কাছে কি বলতে চাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু যখন
সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিচলতি হয়ে পড়েছিলেন, সেই সময় বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলে,
‘তুমি বাংলার মানুষের জন্য রাজনীতি কর। বাংলার মানুষের ভাল-মন্দ তুমি বোঝো। অনেকেই
অনেক কথা বলবে। তোমার মনে যা উদয় হবে তুমি তাই বলবে।’ এই জ্ঞানগর্ভ দিক-নির্দেশনা
ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আজ কালজয়ী ইতিহাস হয়ে
ওঠেছে। ৭ই মার্চ বাঙ্গালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। হাজার বছরের ঐতিহ্য ও
কৃষ্টিকে বুকে ধারণ করে যে জাতি বার বার বিদেশীদের হাতে নির্যাতিত হয়েছে,
হারিয়েছে পথের ঠিকানা, আজকের এই দিনে অধিকার বঞ্চিত বাঙালি জাতি খুঁজে পায়
স্বাধীনতার সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।

মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম বলেন, গোটা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতির স্বাধীনতার
ইতিহাসের তুলনায় আজকের দিনের বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী, কৌশলী ও
রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের হৃদয়ে চিরভাস্কর হয়ে
থাকা একটি অনন্য ঘটনা ঘটেছিল এই দিনে। এই দিনে বাঙালি জাতির মহাক্রান্তি লগ্নে
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গোটা জাতিকে দেখিয়েছিলেন মুক্তির পথ,
স্বাধীনতার দিশা এবং দিয়েছিলেন গেরিলা যুদ্ধের দিক নির্দেশনা। শুনিয়েছিলেন শিকল ভাঙার
গান। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার জন্য জাতিকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিলেন এই
দিনটিতেই। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সামরিক শাসকবর্গকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন সামরিক
আইন প্রত্যাহার, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর, সামরিক বাহিনীকে
ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে এবং হত্যাকান্ডের তদন্ত ও দোষীদের বিচার করতে হবে। এই প্রস্তাব
মেনে নিলে অবশ্য শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের একটা পথ খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু
পাকিস্তানী শাসকরা সেই পথে না গিয়ে যুদ্ধের পথ বেছে নেয় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে
পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. এস এ মালেক বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরও
কঠিন। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়, যদি সত্যিকারভাবে জনগণের মৌলিক
চাহিদাগুলো পূরণ না হয়। সেই লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

দূর্ভাগ্য জাতির যার জন্ম না হলে আমরা স্বাধীনতা পেতাম না, সেই জাতির জনককে এদেশের কিছু
কুলাঙ্গার ও আর্ন্তজাতিক চক্রান্তকারীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এরপর থেকে অন্ধকারের
পথে পথচলা। জাতির জীবনে নেমে আসে দুঃখ-বেদনা আর হতাশা। আশার কথা বঙ্গবন্ধুর কন্যা
চতুর্থবারের মত রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব পেয়ে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উন্নয়নের রোল
মডেল। জাতির পিতার স্বপ্ন আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে। উন্নয়নের এই
গতিধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৪১ সালের মধ্যেই উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের পর্যায়ে উন্নীত
হবে।

আনন্দ কুমার সেন,ঢাকা