রোজকার টুকিটাকি।

রাশেদুল ইসলাম

(সাত)

কান্না আমার মোটেও পছন্দ নয় । আমি নিজে কখনো কাঁদতে চাইনে । আমার সামনে কেউ কাঁদুক, তাও আমি চাইনে । আমি সব সময় হালকা বই পড়ি । হালকা কথা বলি । সবকিছুতে হাসির খোরাক পাওয়ার চেষ্টা করি । করুণ কাহিনীর ধারে কাছে যেতে চাইনে আমি । কিন্তু, বাস্তবতা ভিন্ন । বাস্তবে আমাকে প্রায়ই কান্নার মুখোমুখি হতে হয় । একা থাকলে অনেক সময় বাচ্চা শিশুর মত কাঁদতে ইচ্ছে করে আমার । যেমনটি হয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারী । বৃহস্পতিবার । ২০১৯ সনে । কান্না ঘটনার সূত্র চকবাজারের চুড়ি হাটটা ট্রাজেডি থেকে। অবশ্য আগুন লাগা ঘটনা ঘটে ২০ ফেব্রুয়ারী রাতে । আমার জানা হয় ঘটনার পরের দিন । মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের সকালে ।

রাত ১১টা । সারাদিনে বইমেলায় যেতে ইচ্ছে হয়নি আমার । মাতৃভাষা দিবসেও ভাষার অভাব বোধ করি । এ লেখার ভাষা খুঁজে পাইনে আমি । আমার চোখে রোহানের মায়ের জমাট বাঁধা কান্নার মুখ স্থির হয়ে আছে । মা বিশ্বাস করেন না তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেটি এতো তাড়াতাড়ি তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারে । এখনও নিশ্চয় ছেলেটা কোথাও না কোথাও পড়ে আছে । এখনও পরানটা হয়ত ধুকধুক করছে তার । তিনি সবাইকে করজোড়ে অনুরোধ করছেন তাঁর ছেলেকে খুঁজে দিতে । ছেলের পুড়ে কয়লা হওয়া দেহ হলেও চলবে তাঁর; না হলে ছেলের শরীরের এক টুকরো মাংস । যেটাই পাওয়া যায়; তাই বুকে জড়িয়ে ধরতে চান তিনি । তাঁর স্বামী পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া লাশগুলো একটার পর একটা উলটিয়ে দেখেছেন । কোথাও পাওয়া যায়নি ছেলে রোহানের লাশ । তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চান; যেন ছেলের লাশ পচেগলে যাবার আগে তাঁরা সেটি খুঁজে পান । রিপোর্টার মুন্নী সাহা নির্বাক । দর্শক -শ্রোতা নির্বাক । সকলের চোখই ভেজা । জোর করে কান্না চেপে আছে সবাই । শিশুর মত কান্না পায় আমার ।

কীভাবে আগুনঃ

কথাটা ফেসবুক থেকে নেয়া । ‘প্রথমে একটি পিকআপের সাথে প্রাইভেট কারের সংঘর্ষ । সেই পিকআপে ছিল সিলিন্ডার গ্যাস । সেই সিলিন্ডার গ্যাস বিস্ফোরণ- তার আগে বা পরে কারের সিএনজি বিস্ফোরণ । পাশেই ছিল হোটেল । সেখানে রান্না হচ্ছিল গ্যাসে- সেই গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ । একই সময়ে সাথে থাকা বৈদ্যুতিক খুটির ট্রান্সফর্মারে বিস্ফোরণ। সময় মাত্র ৩০ সেকেন্ড। আগুন ছড়িয়ে যায় কেমিক্যালের গোডাউন থেকে গোডাউনে । দুদিন আগেও সাত ট্রাক কেমিক্যাল ঢুকেছে সেখানে’ ।

এই আগুনের ভয়াবহতা ইতোমধ্যে সবাই জেনেছেন । চুড়ি হাটটার ৫টা ভবন এবং ভবন সংলগ্ন রাস্তার ট্রাফিক জ্যামে আঁটকে থাকা প্রায় সকল মানুষের এক বিভীষিকাময় মৃত্যুর কারণ ঘটিয়েছে এই আগুন । সে দৃশ্য টিভির পর্দায় সবাই দেখেছেন । পত্রিকায় পড়েছেন অনেকে । ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি ঠিকই বলেছেন –‘এ ধরণের ভয়াবহ ঘটনা শুধু মানুষের জানমালের ক্ষতিই করে না; এধরণের ঘটনা মানুষকে কঠোরভাবে সতর্ক করে; যেন ভবিষ্যতের আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে’ ।
সরকার থেকেও বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে । স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বিষয়টি তদারকী করছেন । শিল্প মন্ত্রণালয় অনেক আগে থেকেই পুরানো ঢাকার রাসায়নিক ও প্লাস্টিক কারখানাগুলো স্থানান্তরের জন্য কেরানীগঞ্জে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে বলে জানা যায় । ফেসবুকে একজন লিখেছেন, ‘গেল সপ্তাহেও দক্ষিণের মেয়র মার্কেটে মার্কেটে ঘুরে হাতজোড় করেছেন কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নিতে । কেউ পারছে না তাদের সরাতে; এক এক বাড়িতেই ১৫-২০ টা গোডাউন’ । অর্থাৎ, সরকার, সংশ্লিষ্ট মেয়রসহ পুরানো ঢাকার সাধারণ বাসিন্দা সকলেই এই কেমিক্যাল কারখানা ও গোডাউনের বিপজ্জনক উপস্থিতি থেকে মুক্তি চান । কিন্তু, আঁটকে আছে । কেন ? ফেসবুক লেখক লিখেছেন, ‘পুড়ে ছাই হওয়া ওয়াহিদ ম্যানসনের ওয়াহিদ সাহেব মারা গেছেন আগেই । তার দু’ছেলে এ ভবনে থাকতেন । ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, তারা যে কেমিক্যাল গোডাউন ভাড়া দিলেন, তার বিস্ফোরনেই প্রাণ গেছে নিজেদের পরিবারের সকলের’।

এসব কথার মানে এই দাঁড়ায় যে, ওয়াহিদ পরিবার কেমিক্যালের ভয়াবহ তেজস্ক্রিয়ার কথা জানতেন না । তারা যদি জানতেন কেমিক্যাল গোডাউনের কারণে তাঁদের পরিবারের সকলের করুণ মৃত্যু হবে; তাহলে তাঁরা সেই গোডাউনের উপর বাস করার কথা নয় । আমার মনে হয়, শুধু পুরানো ঢাকার ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা নয়; যে কোন এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার, কেমিক্যাল কারখানা বা যে কোন বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহারে যথাযথ সতর্ক থাকার বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে । কথায় বলে, ‘ভুল করার মধ্যে কোন ভুল নেই; যদি সেই ভুল আবার না করা হয়’ । চকবাজার ট্রাজেডির শিক্ষা থেকে সরকার যে পদক্ষেপ নিবেন, সংশ্লিষ্ট মেয়র যে পদক্ষেপ নিবেন-আশাকরি সকল শ্রেনি-পেশার মানুষ সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিবেন । ঢাকাবাসী সকলেই নিরাপদ জীবনযাপন করুন – এটাই কামনা ।

চকবাজার ট্রাজেডির উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিস এবং বিমান বাহিনীর যে সকল অকুতোভয় বীর সন্তানেরা জীবনবাজী রেখে অংশ নিয়েছেন; অন্যান্য যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ কাজে সহায়তা করেছেন- তাঁদের সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*