রোজকার টুকিটাকি

রাশেদুল ইসলাম

(ছয়)

আজ শুক্রবার । ১৫ ফেব্রুয়ারী । ২০১৯ । কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় দিন গেছে আমার । একটার সাথে অন্য ঘটনার কোন মিল নেই । ধারাবাহিক বর্ণনা দিলেই ভালো হয় বোধহয় । আমি বরং সেটাই করিঃ
ঘটনা- ১
সকালে চন্দ্রিমা উদ্যানে হাঁটতে গিয়ে মনটা ভালো হয়ে যায় । শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের প্রশংসা করছেন কয়েকজন । গতকাল সন্ধ্যায় সোহরাওয়ারদী হাসপাতালে আগুন লাগে । হাসপাতালে প্রায় ১২০০ রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন । হটাৎ আগুন লাগায় সকলে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন । এসময় ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য সাধারণ মানুষের সাথে শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাও উদ্ধার কাজে অংশ নেয় । সকলের একান্তিক চেষ্টায় প্রায় সব রোগীকেই তাঁরা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন । ব্যতিক্রম শুধু একটি শিশু । পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে নেওয়ার সময় শিশুটি মারা যায় । মহান আল্লাহ্ শিশুটির পরিবারের সকলকে এ শোক কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দিন । উদ্ধার কাজে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের ভূমিকা সাধারণ মানুষের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে । আসলে শুধু মেডিকেল কলেজের ছাত্রছাত্রীই নয়; মাননীয় মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ সরকারি- বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সকলে যথাসময়ে যথাযথ দায়িত্ব পালন করার কারণেই এ ধরণের সফল উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে । আমার মনে হয় কাউকে কোন বিপদ থেকে উদ্ধার করা পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো কাজের একটি । আর যিনি এই ধরণের কোন কাজ করেন, তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন । তাই, গতকাল সোহরাওয়ারদী হাসপাতালে আগুন নেভানো বা উদ্ধার কাজে যারা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন; তাঁদের সকলের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ।

ঘটনা- ২

সকাল ১১ টায় বন্ধু আলী আযমের মায়ের মৃত্যু সংবাদ পাই আমি । খালাম্মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন । আজ সকালে মারা যান তিনি । ইন্না লিল্লাহে —– রাজেউন । আমার নিজের মা মারা গেছেন গত ৩১ জানুয়ারী, বৃহস্পতিবার দুপুরে । মাত্র ১৫ দিন আগে । আমি নিজে অনেক লিখি । কিন্তু, মায়ের মৃত্যু সংবাদ নিয়ে একটা কথাও লেখা হয়নি আমার । পরিচিত জনেরা যে কোন অবস্থায় আমাকে শান্ত দেখেন । আমাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, আমি একটা শোকের মধ্যে আছি । এ সময় খালাম্মার মৃত্যু আমার ভিতরের গুমোট কান্নার ভাবটা বাড়িয়ে দেয় । আযম একজন বিভাগীয় কমিশনার । অনেক বড় পদ তাঁর । আমার নিজের পজিশনও কম নয় । অনেক কিছুতেই আমাদের সময় দিতে হয় । শুধু নিজের বাবা, মা বা পরিবারের জন্য আমরা সময় দিতে পারিনে । এই অভিমান আমার মায়েরও ছিল । খালাম্মারও একই অভিমান । তাইতো আমাদের মায়েরা মারা যায় বৃহস্পতি বা শুক্রবারে । যেন সরকারি ছুটির দিনে মায়ের সৎকার শেষে রবিবার অফিস করতে পারে ছেলেরা । আমি জানি আলী আযম এখন বাগেরহাটে । ছুটির এই দু’দিনে মায়ের জন্য শেষবারের মত সময় দিবেন তিনি । তারপর অফিস; আর সারাদিনের ব্যস্ততা । আমাদের মায়েরা আমাদের এই ব্যস্ততাকে ক্ষমা করেছেন কিনা জানিনে । মহান আল্লাহ্ তাঁদের বেহেস্ত নসিব করুন । আমিন ।

ঘটনা- ৩

জুম্মার নামাজের এক ফাঁকে দাণবাক্স সামনে আসে । দাণবাক্সের উপরে মাটির ব্যাংকের মত ছিদ্র করা । সেই ছিদ্র দিয়েই দাণের টাকা ফেলতে হয় । আমি নিজেও তাতে শরিক হই । আমার পাশে বসা ৪/৫ বছরের ছেলেটিকেও টাকা ফেলতে দেখি । কিন্তু, তাঁর বাবা তাকে সন্দেহ করে । বাবার বিশ্বাস ছেলেটি দাণ বাক্সে টাকা ফেলেনি । ছেলেটি দাবী করে সে ফেলেছে । সে তার পাঞ্জাবির দু’ পকেট উল্টে পাল্টে বাবাকে দেখায় । বাবা ছেলেটির পাজামা ধরে টান দেন । পাজামার নিচেও প্যান্ট আছে দেখা যায় । সেই প্যান্টের মধ্যে হাত দিয়ে বাবা ২০ টাকা উদ্ধার করেন । ততক্ষনে দাণের বাক্স অনেক দূর চলে গেছে । আমি মনে মনে বেশ আহত হই । আমার মনে হয় আমাদের বাবামাদের বোধহয় বুঝতে একটা ভুল হচ্ছে । একজন মুসলমান হওয়া বা নামাজ পড়া অনেক পরের কথা । মানুষ হিসেবে একজন মানবশিশুর প্রথম দরকার সত্যবাদী হওয়া । আর এই সত্যবাদী হওয়ার শিক্ষা বাবামাকেই দিতে হবে । আজকের শিশুই আগামী দিনের পরিবার, সমাজ ও দেশ পরিচালনা করবে । ছেলেমেয়েকে আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কি আমাদের মত বাবা মায়ের নয় ?

ঘটনা- ৪

সন্ধ্যায় বইমেলা । বাঙালি যে কেমন উৎসবপাগল বইমেলায় না গেলে বোঝা যায় না । হাজার হাজার মানুষ । এতো ভিড় আমার পছন্দ নয় । তারপরও আমাকে আজ যেতে হয় । যেতে হয় ‘পাগলামামা’র কারণে । ‘পাগলামামা’ প্রকাশ করেছে ইছামতি প্রকাশনী । এই স্টল খুঁজে বের করা আরও কঠিন । শুধু স্টলের নম্বর ৫৭০ জানাই যথেষ্ট নয় । জায়গার অবস্থান শুনেও খুঁজে বের করা সাধনার ব্যাপার । গতবার ইছামতি প্রকাশনীর স্টল সামনের দিকে ছিল । তখন প্রচণ্ড ভিড় ছিল সেই স্টলে । বিক্রয় ছিল রেকর্ড পরিমাণ । এবার ঠিক উলটো । আমার অবশ্য এসব জানার কথা নয় । এসব প্রকাশকের কথা । আমি শুধু এটুকুই বুঝি, প্রকাশকের তাড়া না থাকলে, আমি কোনদিন এতো কষ্ট করে ঐ স্টলে যেতাম না । তবে যারা কষ্ট করে স্টলে গিয়ে ‘পাগলামামা’ কিনছেন; তাঁদের সকলের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি । শেষবেলায় গিয়ে আমি শুনি অনেকেই আমার অটোগ্রাফ চেয়েছিলেন । আমি পেলাম একজন হাফেজ নিয়ামতউল্লাহ্‌কে । একজন যুবক হাফেজ ‘পাগলামামা’ কিনছেন দেখে আমার ভালো লাগলো । শুধু অটোগ্রাফ দেয়া নয়; হাফেজ সাহেবের সাথে আমাকে সেলফিতেও ঘাড় কাঁত করে দাঁড়াতে হোল ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*