রাষ্ট্র পরিচালনার ধারার রক্ষা কেন প্রয়োজন

ডা. এস. এ. মালেক, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও কলামিষ্ট,
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনেক পূর্ব থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলে আসছেন যে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজনেই তাকে ক্ষমতায় যাওয়া দরকার। এ কথার অর্থ এই নয় যে, একটা দলকে চিরস্থায়ী ক্ষমতায় থাকতে হবে। বোধহয় তিনি বলতে চেয়েছেন, উন্নয়নের স্বার্থে যেসব বৃহত্তর প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, তার অনেকটাই শুধুমাত্র একটি মেয়াদকালে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। তাই ঐসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাকে পুনরায় ক্ষমতায় আসা দরকার। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটা দেশে যেখানে প্রতিপক্ষ একটা দল ক্ষমতায় আসলে অত্যন্ত গুরুত্ব জাতীয় প্রকল্প স্থগিত রাখেন বা বিকল্প প্রকল্প শুরু করেন। সেখানে একটা দেশপ্রেমিক দল ক্ষমতাসীন হয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ করলে তা যদি পরবর্তী সরকার পরিত্যাগ করেন তাহলে উন্নয়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে বাধ্য। বাংলাদেশে এটা বাস্তব ঘটনা। অন্তত দুটি ক্ষেত্রে এর স্বúক্ষে উদাহরণ উপস্থাপন করা যাবে। ধরুন স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার সরকার প্রতি ইউনিয়নে একটা স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রায় ৭৫ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার পর বেগম জিয়া ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা সরকারের ঐ প্রকল্প বাতিল করেন। ২০০১ সালে যদি শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হতেন তাহলে ২০০৩ সালের ভিতর এই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলি সম্পন্ন হত এবং গ্রামের জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে যেত। মনে হয় বেগম জিয়া দেখলেন এতবড় একটা কাজ করে শেখ হাসিনা বাহŸা পাবেন, এটা হতে দেয়া যায় না। তাই তিনি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত করলেন। এখানে ক্ষতিটা হয়েছে কার? প্রতিহিংসা পরায়ণের বশবর্তী হয়ে বেগম জিয়া যে কাজটি করেছেন,
তার ফলে হাজার হাজার মানুষ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এরকম অনেক উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে; যা বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। ধরুন পাওয়ার সেক্টরের কথা। ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল এবং ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত বেগম জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রে এই সময় বিশেষ কোন উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। ২০০১ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা ছাড়েন তখন দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ২.৫ হাজার মেগাওয়াট। ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত বেগম জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোন অগ্রগতি হয়নি। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই ১০ বছরে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। গত কয়েক দিন আগে ৯টি প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ৬২ মেগাওয়াট নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ করেছেন, এই প্রকল্পগুলি শেখ হাসিনার পূর্বের সরকারেই গ্রহণ করেছিলেন। ক্ষমতাসীন হয়েই এই সরকারের আমলেই বাস্তবায়ন হয়েছে। ধরুন শেখ হাসিনা যদি ক্ষমতায় না আসতেন তা হলে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব হতো না। প্রশ্ন জাগে তাহলে বেগম জিয়ার আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষেত্রে কোন কাজই করা হয়নি? হয়েছে, ২০০১-০৬ সালে বিদ্যুতের খুটি উৎপাদন ও কিছু সঞ্চালণ লাইন তৈরী করে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোন ব্যবস্থা না করে বিদ্যুতের খাম্বা ও সঞ্চালন লাইন তৈরী করার উদ্দেশ্য কি ছিলো? বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গিয়েও তারা যে ধরনের মুনাফা চান, তা লাভ করতে পারতেন, কিন্তু দ্রæত টাকা বানাবার প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন করার জন্য খাম্বা তৈরী করাই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।

এখন মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২১ হাজার মেগাওয়াট। জনসংখ্যার প্রায় ৯০% লোকেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ২০২১ সালে প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের বাতি জ্বলবে। প্রতিটি সেচ প্রকল্পে বিদ্যুৎ চলবে। কোন গ্রামের মানুষকে অমাবস্যার রাতে ভুতুড়ে অন্ধকারে রাত কাটাতে হবে না। মাত্র ২টি ক্ষেত্র উল্লেখ করলাম। ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যেসব উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন তার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী ২ দশক কাজ করা হতো, তাহলে বাংলাদেশ অনেক কিছুতেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হতো। বঙ্গবন্ধু একটা প্রাদেশিক সরকারকে জাতীয় সরকারে রূপান্তরিত করেছেন। পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলার ঢাকায় একটি সেন্ট্রাল ডিফেন্স ছাড়া তো আর কিছুই ছিলো না। বঙ্গবন্ধুকে জিরো থেকে শুরু করতে হয়েছিল। ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্র্ধসঢ়;া ছিল না। মাত্র ৭৮০ কোটি টাকার বাৎসরিক বাজেট দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পুর্নগঠনের কাজ শুরু করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশ পুর্নগঠিত করার জন্য ঐ অর্থ ছিল খুবই সীমিত। তারপরেও এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে বঙ্গবন্ধু হাত দেননি। তাই প্রধানমন্ত্রী প্রায় বলে থাকেন যেখানেই তিনি হাত দিচ্ছেন সেখানেই বঙ্গবন্ধুর কর্মকান্ডের প্রমাণ মিলে। বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে ৩ বছর গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ শাসন করেছেন। তারপর ২১ বছর শাসন করছে ২ জন সামরিক শাসক ও একজন আধা সামরিক শাসক (৭৫- ৯৬) এই ২১ বছর দেশে পাকিস্তানী ধারায় যে উন্নয়ন হয়েছে তা কোন ক্ষেত্রে দেশকে স্বাবলম্বী করতে পারেননি। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে জিয়া, এরশাদ ও খালেদার আমলে দেশে প্রতিবছর ১৫-৫০ লক্ষ টন চাল আমদানী করতে হয়েছে। আর শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে ক্ষমতাসীন হয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে ২০০১ সালে ক্ষমতা ছাড়েন তখন ১৫ লক্ষ টন খাদ্যশস্য গুদামে ছিলো।

২০০১-০৬ সাল পর্যন্ত বেগম জিয়ার ক্ষমতাসীনকালে আরও লক্ষ লক্ষ টন চাল আমদানী করতে হয়। ২০০৮ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হয়ে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেন। এখন দেশে সাড়ে ১৬ কোটি লোকের খাদ্যের প্রয়োজন ৩.৫০ কোটি টন। আর উৎপাদন হচ্ছে ৩.৬৫ কোটি টন। প্রায় ১৫ লক্ষ টন উদ্বৃত্ত থাকার কথা রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এদেশে জনকল্যাণমুখী যেসব জনপ্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে ও যার সুফল জনগণ ভোগ করছে তার সব কয়টি বাস্তবায়ন করেছেন শেখ হাসিনা। বেগম জিয়ার আমলে এইসব প্রকল্পের কোন একটা বাস্তবায়ন হয়েছে এরকম উদাহরণ দেওয়া কঠিন হবে। তাই শেখ হাসিনা বলেন উন্নয়নের ধারাবাহিকতার স্বার্থেই তাকে ক্ষমতায় আসতে হবে। এবার ক্ষমতাসীন হয়েই নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী যেসব কাজে তিনি হাত দিয়েছেন এবং অত্যন্ত দ্রæততার সাথে তিনি কাজ করবেন বলে মনে হচ্ছে। তাতে আগামী ৫ বছরে দেশকে উন্নয়নের শীর্ষে পৌঁছে দিবে। এই সরকার ক্ষমতাসীন হয়ে সঠিকভাবে উপলব্ধি করেছেন যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের বয়স এখনো দেড় মাস হয়নি। এর ভিতরেই সর্বক্ষেত্রে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মাদক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি দমনে সরকার যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তাতে মনে হয় অপরাধীরা আতঙ্ক।

বিগত কয়েক দশকে এরূপ আতঙ্কিত দেখা যায়নি। শেখ হাসিনা যা বলেন তাই করে থাকেন। নির্বাচনের পূর্বে যা বলেছিলেন এবং এখন যা বলছেন তা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়
তাহলে দেশের বাইরের ও ভিতরের চেহারাও পাল্টে যাবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। এই প্রত্যাশার কারণে জনগণ তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেছে। জনগণের প্রত্যাশা পুরণে তিনি যে সদা জাগ্রত থেকে
কাজ করে যাবেন বলে মনে হচ্ছে। তিনি অবশ্যই প্রমাণ করবেন যে তিনি শুধু সাধারণ অর্থে সরকার প্রধান নন, জাতির জনকের কন্যাও বটে। এ জাতিকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দেওয়াই তার লক্ষ্য। এদেশে যাতে একটা মানুষও না
খেয়ে থাকে, প্রতিটি লোক শিক্ষা পায়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শীর্ষস্থানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় জাতিসংঘে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় সে ব্যবস্থা শেখ হাসিনাকে করে যেতে হবে। প্রয়োজন বোধে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্র অব্যাহত রাখতে হবে। কত মেয়াদ তিনি ক্ষমতায় থাকবেন এটা বড় কথা নয়। প্রয়োজন বোধে ভিন্নতর অবস্থানে গিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটাই জনগণের প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*