প্রথাগত বাঙালীর কি বলতেই হবে, দেশটার কিচ্ছু হবে না!!!

প্রথাগত বাঙালীর কি বলতেই হবে, দেশটার কিচ্ছু হবে না!!!
বাংলা কিংবা বাংলাদেশ নিয়ে যে আমার বুদ্ধির ঢেকি, তা কিন্তু মনে করার কোনোই কারন নেই। সেই দুঃসাহস আমি কখনোই দেখাতে চাই না। শুনবেন, কেন? কারন ছাত্র জীবনে আমি একমাত্র যেই বিষয়টিতে ফেল নম্বর পেয়েছিলাম সেটি বাংলা দ্বিতীয় পত্র (29 নম্বর)। আর সেটা ছিল আমি যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। তাহলে বুঝতেই পারছেন, আমার বাংলার দক্ষতা কোন মাত্রার! তাই বলে কি আমি বাংলার অনুরাগী নই! কি জানি! তবে, আমি এটা জানি বাংলা আমার মাতৃভাষা । আমার মায়ের ভাষা। যে ভাষায় কথা বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। যে ভাষার দক্ষতা অর্জন করতে আমাকে কোনো TOEFL কিংবা IELTS দিতে হয়নি। নামতে হয়নি কোনো ভাষা যুদ্ধে। যে ভাষা আমার উপর কোন চাপ সৃষ্টি করেনি, যে কখনো বলেনি “তোমাকে সফল হতে হলে প্রচুর পড়াশোনা করে উচ্চ নম্বর পেতে হবে, নতুবা তুমি ব্যর্থ”। যে ভাষা আমাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে আমাকে করেছে সমৃদ্ধ। এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার সম্মান । জানি হয়তো ভাবছেন, ও এখন ফেব্রুয়ারি মাস তাই এ কথা বলছি। হ্যাঁ, কিছুটাতো তাই। ক্ষনে ক্ষনেই তো উপলব্ধিটা জাগ্রত হয়!। তবে এরপরও কি কেউ বলবেন, দেশটার কিচ্ছু হবে না? আচ্ছা, ভাষা সংস্কৃতির বুলিয়া ওড়ানো না হয় বাদই দিন।

অর্থনীতি, সেও কি কম ধাবমান! গত বছরটি ছিলো আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশের সুত্রপাত। আমার এক দাদা প্রায়ই বলেন, বাংলাদেশের কোনো উন্নয়ন, উদ্ভাবন কিংবা অগ্রগতি শুনলে, দাদার নাকি গর্বে বুকটা ভরে যায় । দাদার সুরে সুর মিলিয়ে আমিও বলতে চাই, আমারো কিন্তু গর্বে বুক-পিঠ আপাদমস্তক ভোরে ওঠে। তাও কি কেউ কেউ বলবেন, দেশটার কিচ্ছু হবে না!!
আসলে কি সমস্যাটা দেশের! দেশ কি এক্ষেত্রে কোনো ভুমিকা পরিচালনা করছে! নাকি প্রগতিশীল দেশবাসী, যারা আমরা সবাই আত্মনিয়োজিত আত্মপরিচর্যা, ব্যক্তি উন্নয়ন ও পশ্চিমামূখী পরিবর্তনের নেশায় আজ ডুবে আছি গভীর এক মহা-উন্মাদনায়? তাঁহারাই কি মূল ভূমিকাটি সুনিপুণভাবে পরিচালনা করে চলছিনা?

আজকাল প্রায়ই বিভিন্ন আলাপচারিতায় শুনি, প্রতিযোগিতামূলক এই সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে আমাদের উদ্বুদ্ধকরন দিকনির্দেশনার নাকি খুবই প্রয়োজন । সহজ ভাষায় আমরা একে Motivational talk বলে থাকি। এই motivational talk এর বাজার এখন ব্যাপক চড়া। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সন্দীপ মাহেশ্বরি থেকে শুরু করে আমাদের দেশের সোলায়মান শুখনসহ আরো অনেকেই এই বাজারে ব্যাপক চাহিদার তালিকাভূক্ত । আমি সরাসরি এর বিপক্ষে অবস্থান না নিলেও খুব বেশি মাতামাতির বাস্তবিক প্রয়োজনীয়তাটা ঠিক খুঁজে পাই না। যখন আপনি নিজেই দিশেহারা, বস্তু বিষয়ক জ্ঞানে নিজেকে এখনো অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের মতো বর্নিল পরিসরে তুলে ধরতে পারেনি, কিংবা এপিজি আবুল কালাম আজাদ স্যারের মতো সফলতার তুঙ্গে পৌছাতে পারেন নাই, তখন কিভাবে অন্যের উদ্বুদ্ধকরনের প্রয়াস মেটাচ্ছেন? হ্যাঁ চটুল মিষ্টি কথায় কারো কারো ভাগ্য পরিবর্তন হতেই পারে, যেমনটি ‘ঝড়ে বক মরে, আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে’ বচনটির মতোই। যাক তাওতো এক্ষেত্রে প্রগতিশীল ভাইদের মুখে অন্ততঃ একথাটি শুনতে হয় না যে, দেশটার কিচ্ছু হবে না! ধন্যবাদ এই অবদানের জন্য ।

বাংলাদেশ আজ নিঃসন্দেহে অগ্রগতির ধারায় প্রতিযোগিতামূলত অবস্থানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পরেছে, সেটা আমার কোনো মনগড়া কথা নয়। পরিসংখ্যান সেটাই বলে। তাহলে কে করে দিল এই উন্নয়ন! কোনো আলাদিনের চেরাগ পেলো কি বাংলাদেশ! হ্যাঁ পেয়েছে তো বটেই। অনেকের মতে আমাদের যেই ভাই বোনেরা প্রবাসে থেকে প্রচুর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করে সেই টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন, কিংবা আমার তো চামে চিকনে একটা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে পরতে এসেছেন তাদের কথা হয়তো প্রথমেই বলবেন। মোটেই অস্বীকার করছি না তাদের এই অপরিসীম অবদানের কথা। কিন্তু আমার ভাবনা আসলে অন্যদিকে। আচ্ছা একবার ভেবে দেখেছেন কি, যেই কৃষক মাঠে অক্লান্ত পরিশ্রম করে সোনালী ফসল ফলায়, কিংবা যেই ভাই-বোনটি শহরে এসে শরীরে নোনা গন্ধবয়ে কাপড়ে সেলাই মেশায়, তিনি কি কখনো বলেছেন, দেশটার কিচ্ছু হবে না! ও তিনি হয়তো আপনার মতো হুন্ডি করে একটু বেশি লাভের আশায় ভিন্নপথে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠাচ্ছেন না, কিংবা বিদেশে এসে কোনো বিদেশি বন্ধুর অযাচিত সান্নিধ্যের আশায় অযথা দেশের বারটা বাজাচ্ছেন না। নিরবে কোদাল চালিয়ে যাচ্ছেন, পাথরপ্রায় মরুর বুকে সবুজের চাদর বিছাবেন বলে, আর আরেকদল নতজানু হয়ে নকশীকাথার মাঠ বুনে চলেছেন। সে হয়তো নিজেও জানে না, মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ গড়তে তার কত পুঁজি তিনি খাটিয়েছেন। তিনি কি একবারও বলেছেন, দেশটার কিচ্ছু হবে না? মনে হয় না। কারন হয়তো তিনি দেশটাকে অগাধ ভালোবাসেন, অথবা তার আসলে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

তবুও আশাবাদীরা কখনো আশা ছাড়ে না। কথায় আছে, ‘আশায় বাঁচে চাষা’। আশাহীন মানুষ আর যাই পারুক, হাল ধরতে পারে না। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ উন্নত হয়েছে, যার পেছনা একটা জেনারেশনের অবদান রয়েছে। সেই জেনারেশন পরিশ্রম করে দেশটাকে একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামো দান করে গেছেন, যার ভিত্তিতে পরবর্তী জেনারেশন বাকিটা এগিয়ে নিয়ে গেছে। অনেকটা বাড়ি তৈরি করে ভাড়া দেয়ার মতো। আমাদের দেশেও কি সেই রকম একটা কষ্ট সহিষ্ণু জেনারেশনের খুব বেশি দরকার নয় এই মুহুর্তে? মন চাইলেই কি রাতারাতি সব পাল্টে ফেলা যায় । বিদেশে এসে একটু আধটু পরের উন্নয়ন দেখেই কি আপনি আপনার নিজের পরিচয়টা পাল্টে ফেলতে পারবেন? যেখানে দেশই আপনার পরিচয়, দেশই আপনার শেষ আশ্রয়, সেখানে দেশটার কিচ্ছু হবে না, এ কথাটা কি বলা ঠিক? নাকি নিজেকে পাল্টানো ঠিক? ভাবছেন এতক্ষন এসব কথা আপনাকে বললাম? আরে না! এসব কথা আমি আমার নিজেকেই বললাম। সবার আগে আমি আমার নিজেকে পাল্টাতে চাই। আর স্বাক্ষি হিসেবে আপনাদের রাখলাম। যেন কখনো পালাতে চাইলে এই আপনারাই আমাকে ধরে ফেলেন। আর যদি আপনিও আমার মতো হন, তবে আমার পথে আপনাকেও স্বাগতম। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবেই, সে আমি চাই বা না চাই। এই বিশ্বাসটুকু আমার এখনো মরেনি। আর তাই এখনো নিজেকে আয়নায় দেখতে পাই। চলুন এবার নিজেরাই একটু বদলে যাই। দেশটা না হয় থাকুক শান্তিতে । আমার উদ্দেশ্য কাউকে অপমান নয়, শুধু আত্মঅহমিকার অবসান ঘটিয়ে উদারচিত্তে হাল টেনে ধরা। আশা করি আমার এই উদাত্ত আহ্বানে আপনার সাড়া পাবো। ধ্বনাত্বক মনোভাবের পরিচয়ে নিজেকে সামনে তুলে ধরবো। ধন্যবাদ

সংগৃহীত ঃ শামিম আহমেদ  এর ওয়াল থেকে , গবেষক, দক্ষিণ কোরিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*