জাতির উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ও এর গুরুত্ব

ডাঃ এস এ মালেক, বিশিষ্ট কলামিষ্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ,
একচ্ছত্রভাবে বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আবার সংসদ ও সরকার গঠন করেছেন। নতুন মন্ত্রী সভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম মন্ত্রী সভার কর্মকান্ড
থেকে বোঝা যায় অতীতে যে উন্নয়ন তৎপরতা শুরু হয়েছিল, যা দেশকে একটা বিশেষ পর্যায় পৌছে দিয়েছে, তাকে দ্রæততার সাথে এগিয়ে নেওয়ায় সরকার তার আশু করণীয় মনে করছেন। প্রথমেই বলতে হয়, মন্ত্রী সভায়
এমন কিছু নতুন মুখ স্থান পেয়েছেন, যারা সু-দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অধিকারী, তাদের পূর্ব সূরিরা যে রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, একই আদর্শে তারা বিশ্বাসী। দু’একজন ছাড়া রাজনীতিতে তাদের নবীন বলা যাবে না। কারণ তাদের অধিকাংশের বয়স ৪০-৫০ এর কাছাকাছি। সুদীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে তারা জড়িত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে তাদের অবস্থান রয়েছে। শিক্ষা, দীক্ষা, অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক আনুগত্য ইত্যাদি কারণে প্রধানমন্ত্রী তাদের মন্ত্রী সভায় স্থান দিয়েছেন। আশা করা যায়, এবারের সরকার যে কঠিন দায়িত্ব পালন করতে অগ্রসরমান মনে হচ্ছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীকে তারা সঠিক ভাবে সহযোগীতা করবার যোগ্যতা রাখেন। গত ২৫শে জানুয়ারী ২০১৯ জাতির উদ্দেশ্য দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ভাষণে যে সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন, তাকে বর্তমানে জাতীয় সংকট বলে অভিহিত করা যেতে পারে। বিগত ১০ বছরে দেশকে উন্নয়নের শীর্ষ পর্যায়ে পৌছে দিলেও যে সব ক্ষেত্রে ঘাটতির কারণে আগামী দিনে দেশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বেশ কিছুটা দুরুহ বলে বলে মনে হয়, তার প্রত্যেকটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আলোকপাত করেছেন। এ সরকার গঠিত হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে
দুর্নীতি সমূলে নির্মূলে যে তৎপরাতা শুরু হয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স যে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন, তা নির্ভয়ে, বাধাগ্রস্থহীন ভাবে অনুসরণ করতে পারলে, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে যে বিশেষ অগ্রগতি অর্জিত হবে, তাতে কোন সন্দেহ নেয়। সৎ, সাহসী ও নিবেদিত প্রধানমন্ত্রী চান উন্নয়নের অগ্রযাত্রা যেন দুর্নীতির কারণে ব্যাহত না হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা যে বাঞ্চনীয়, তা ভালকরে জেনে শুনে প্রধানমন্ত্রী এবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছেন। এ কথা ঠিক শুধুমাত্র প্রশাসন বা সরকারী ভাবে তৎপরতার মাধ্যমে দুর্নীতি দূর হবে, বাস্তবতাটা এমন নয়। পৃথিবীর সকল দেশেই দুর্নীতি রয়েছে। এটা সমূলে উচ্ছেদ করতে হলে যে সব আর্থ-
সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হয়, তা সময় সাপেক্ষ। তবে যাত্রাটা যদি শুরু হয়, তা হলে মানুষ আশার আলো দেখতে পাবে। একমাত্র দুর্নীতি রুখতে পারলে ২০-২৫% উন্নয়ন কার্যক্রম বেশি হতো। দ্বিতীয় বৃহত্তম

জাতীয় সংকট হচ্ছে মাদক ব্যবসা ও মাদকাসক্ত। এ ক্ষেত্রেও মাদকের মূল ঘাটি কক্সবাজার এলাকায় সরকার যে তৎপরতা শুরু করেছেন, তা প্রশংসনীয়। প্রায় ২০০ মাদক ব্যবসায়ী আত্মসর্ম্পণে রাজী হয়েছে। সরকার মাদক ব্যবসায়ী ও
মাদক সেবীদের পূর্নবাসন করবেন। একদিকে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও অন্যদিকে পূর্নবাসন কার্যক্রম নিশ্চয়ই অবস্থার উন্নতি হবে। মাদক যে কিভাবে আমাদের দেশ মাতৃর্কার উপর আঘাত হানছে, তা সর্বজনবিদিত। দেশের মাদক অর্থনীতি প্রবর্তিত হওয়ার কারণে সামাজিক ক্ষেত্রে যে অরাজকতা, বিশৃংঙ্খলা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে, এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে একদিকে অর্থনীতি বিপদ সংকুল হবে, অপর দিকে জাতি হিসেবে দর্শন ভিত্তিক প্রাণ শক্তি নিয়ে টিকে থাকবো কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে বলতেই হবে সরকারী তৎপরতা যতই হোক না কেন , সর্বক্ষেত্রে সামাজিক উদ্যোগ ছাড়া এই কঠিন কাজ সম্ভব নয় । প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য স্পষ্টতঃই বলেছেন ,আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ভিত হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক, গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ,সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা,এমন উন্নয়ন তৎপরতা নয়, যা গনতন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন ; মুষ্টিমেয় নয় ,সামগ্রিক কল্যাণসাধন ,আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা,সুশাসন নিশ্চিতকরণ , ৫বছরে প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এর সবকিছুই প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন। প্রায় ১৫ বছর দেশ শাসন করে জাতির জনকের কন্যা হিসেবে তিনি যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন ,তার
আলোকেই তিনি বলেছেন । সর্বদিকে প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন এই ভাষণে দেশ এবং জাতিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রæতি রয়েছে। পরিকল্পিত প্রতিশ্রæতি বাস্তবায়ন করতে পারলে আমরা অবশ্যই প্রত্যাশিত সফলতা অর্জন করতে পারবো। প্রধান মন্ত্রী তার ভাষণে জাতীয় ঐক্যের আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিরোধী দলের নির্বাচিত এম.পি সংখ্যায় যাই হোক না কেন ,সংসদে বিরোধী দল যাতে তাদের ভূমিকা রাখতে পারে সবধরনের সহযোগিতা সবসময় তিনি দিবেন। নির্বাচনে বিরোধী দলের ভরাডুবির কারণ বিশ্লেষণ করে তিনি যেসব ব্যাখ্যা দিয়েছেন ,তার সাথে বাস্তবতার মিল দেখা যায়।গনতন্ত্রে বিরোধীদলের ভূমিকা অত্যন্ত প্রয়োজন বিধায় তিনি বিরোধী দলকে সংসদের ভিতরে ও বাইরে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়েছেন। তাঁর এই আন্তরিক আহবানকে সাড়া না দিয়ে মূল বিরোধী দল প্রত্যাখ্যান করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যে প্রতিহিংসামূলক ও অত্যন্ত নেতিবাচক, তাতে কোন সন্দেহ নেয়। জাতির জনকের কন্যা হিসেবে, বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে, সরকার প্রধান হিসেবে তিনি বিরোধী দলকে দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠে সুসংগঠিত হয়ে সংসদের ভিতরে ও বাইরে দায়িত্ব পালন করার আহবান জানিয়েছেন, এটা তার নৈতিক দায়িত্ব। এটা কোন দুর্বলতাজনিত বিষয় বা নির্বাচন অনুষ্ঠানের তথাকথিত অনিয়মতান্ত্রিকতা ঢাকবার অপকৌশলও নয় । বিশ্বের প্রায় সব দেশই নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন । আন্তজার্তিক পর্যায়ে এই সরকারের বৈধতার কোন প্রশ্ন উঠছেনা । যারা বাংলাদেশের উন্নয়ন

সহযোগী , সরকারের সাথে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন । দেশের অভ্যন্তরে বিপুল ভোটে শুধু জনগন বিজয়ী করেননি , জনসমর্থন সরকারের আছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে বেড়েছে। গনতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধীদলের মোকাবেলায় কোন রুপ বাধাদেওয়া হয়নি । বিরোধীদলের শোচনীয় পরাজয়ের কারণে যাতে তাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে না পড়ে, এইজন্য প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন , সংখ্যায় কম হলেও তারা সংসদে যোগদিয়ে সংসদীয় গনতন্ত্র অব্যাহত রাখুক। তাছাড়া উন্নয়ন ও অগ্রগতির পশ্নে অতীতের মত বাধা হয়ে না দাঁড়ায় একারণেই তিনি সার্বিকভাবে জাতীয় ঐক্যের আহবান জানিয়েছেন । সবকিছু ভুলে গিয়ে দেশের স্বার্থ সামনে নিয়ে তিনি একদিকে যেমন বিরোধীদলকে সহযোগিতা করছেন , বিরোধীদলের উচিৎ সরকারকে সমর্থন দেওয়া । জাতির প্রয়োজনে ঐতিহাসিক কারণে তিনি মূল বিরোধীদলের সাথে বৈঠকের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন , তা অবশ্যই সময়োপযোগী। নির্বাচনী ইস্তেহারে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রæতি এবং
২০৪১ সালের মধ্যে রুপকল্প বাস্তবায়ন করে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার যে ঘোষণা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন , এর সফল বাস্তবায়ন করতে হলে জাতীয় ঐক্য বড় প্রয়োজন । প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা অত্যন্ত বড় মন নিয়ে জাতীয় ঐক্যের যে আহবান জানিয়েছেন , রাজনৈতিক দল গুলোর উচিত এই সুযোগ হাত ছাড়া না করা। হীনমনতায় না ভুগে উদার মন নিয়ে এগিয়ে এলে বরং দেশের কল্যান হবে । বিরোধীদলের অনুভব করা উচিত অতীতে তারা যে ধ্বংসাতœক কার্যক্রম করেছেন , এর প্রবর্তন করলে জনগন তা প্রত্যাখান করবে । যদি তারা গনতন্ত্রে বিশ্বাসী হন, এই সংসদের আকার ও প্রকৃতি যায় হোক না কেন ,তাদের সংসদে যোগ দিয়ে সংসদীয় গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা । বাংলাদেশে গনতন্ত্রের কোন সংকট নেই । এটা সঠিক নয় । সংকট আছে । গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সেই সংকট মোকাবেলা করতে হলে হঠকারিতা বা সন্ত্রাসের মাধ্যমে তা অর্জন সম্ভব নয় । নির্বাচনে যদি কিছু অনিয়ম হয়েও থাকে , বিরোধীদলের উচিৎ প্রতিনিধিত্ব সংসদে যোগদেওয়া । সংখ্যা বিবেচ্য নয় , গুনগত মান বজায় রেখে তারা এই সংসদকে প্রানবন্ত ও সফল করতে পারেন , যদি তারা দায়িত্ব -কর্তব্য সর্ম্পকে সচেতন হন । জাতির উদ্দেশ্য তার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যে আবেদন জানিয়েছেন , তাতে সাড়া দিয়ে সংসদে যোগদান ও সংসদীয় গনতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য বিষয় বলে দেশের সচেতন মহল মনে করেন । এই কথার অর্থ এই নয় যে , রাজপথের আন্দোলন চিরতরে বন্ধ হোক । সংসদের ভিতরে ও বাইরে এবং রাজপথে বিরোধীদল ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এটা জনগণের বিশ্বাস । প্রধানমন্ত্রীর বৃহৎ আবেদন যেন ব্যর্থ না হয়। গনতন্ত্রে সরকার ও বিরোধীদলের ভূমিকা
অবিস্মরণীয় ও সহায়ক। তাই রাজনৈতিক দল গুলোকে দেশের কল্যাণে রাজনীতি করা দরকার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*