রোজকার টুকিটাকি

রাশেদুল ইসলাম, 
(চার)

‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’ – এ কথার অর্থ এখন আমি বেশ বুঝতে পারছি । কয়েকদিন আগে আমার স্ত্রী আমার জন্য একসেট শীতের কাপড় এনেছেন । পুরু মখমলের মত নরম কডের একটা পাজামা এবং একই রকম আরামদায়ক হাতাওয়ালা একটা উলেন গেঞ্জি । রাতের বেলা সে দুটো পরে নবাবী কায়দায় আমি বসে থাকি । এই পোষাকে পৌষ মাসের এই তীব্র শীত আমার কাছে খুব আরামদায়ক মনে হয় । এই পৌষ মাসে নিজেকে আমার মোঘল সম্রাটের মত একজন সুখী মানুষ মনে হয় । কিন্তু, অনেক পুরানো একটা স্মৃতি আমার এই সুখের অনুভূতিকে কেমন যেন ম্লান করে দেয় । অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার মন ফিরে যায়, সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের একটা গ্রামে ।

সুনামগঞ্জের হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি আমার পরিচিত । আবার এ অঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন রুক্ষ আবহাওয়াও আমি দেখেছি । প্রায় ৩৫ বছর আগের কথা । বোধহয় ১৯৮৩ সন । আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র । গবেষণার কাজে হাওর এলাকায় । দুপুরের কড়া রোদ্দুরে গ্রামের একটা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আমি । পুকুরের একপাশে দুটো গরুর গা ধোয়ানো হচ্ছে । অন্যপাশে দুজন মহিলা কাপড় কাচ্ছেন । কয়েকটি ছেলেমেয়ে গোছল করছে । আমি পুকুর ঘেঁষা একটা বাড়িতে পানি খেতে চাই । সাথে সাথে সেই বাড়ির একটি ছেলে গ্লাস হাতে পুকুরে নামে । পুকুর থেকে হাতের গ্লাসটি ভরে নিয়ে, ছেলেটি আমার হাতে দেয় । আমি অনেকক্ষণ গ্লাসের পানির দিকে তাকিয়ে থাকি । তারপর পানি মুখে না দিয়ে, গ্লাসটি ছেলেটির হাতে ফেরত দিই । একজন বয়স্ক মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসেন । তিনি জানান, গ্রামে কোন টিউবওয়েল নেই । আশেপাশে অন্য কোথাও পানির ব্যবস্থা নেই । এই পুকুরের পানি দিয়েই গ্রামের সকল মানুষের গোছল, রান্নাবান্না সবই করতে হয় । তিনি আমার জন্য একটা ডাব পাড়ার ব্যবস্থা করেন । আমাকে ঘিরে থাকা গ্রামের ভুখানাঙ্গা অনেক মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে, আমি সেই ডাবের পানি পান করি । এই পোশাক পরে এতো বছর পর সেই স্মৃতি কেন যেন আমার মাথায় ঘুরপাক খায় । আমি দেখি আমার চারিদিকে গ্রামের সেই ভুখানাঙ্গা মানুষ । পৌষমাসের সর্বনাশা এই শীতে কম্পমান তাঁরা । আমি নিজে গরম কাপড় গায়ে দিয়ে পরিতৃপ্ত নয়নে তাকিয়ে আছি তাঁদের দিকে ।

সুনামগঞ্জের সেই গ্রামে আমার আর যাওয়া হয়নি । গ্রামের নামও আজ আর মনে নেই । এ ধরণের জানাঅজানা অনেক গ্রামের অতিসাধারণ মানুষের সাহায্য পেয়েই আমার বর্তমান এই অবস্থান । তবে, আমার দলে আমি একা নই । অনেকেই আছেন । সকলে যদি আন্তরিক হই; তাহলে এই পৌষ মাসের সর্বনাশা শীতের হাত থেকে, আমাদের অতিসাধারণ মানুষদের আমরা রক্ষা করতে পারি । প্রয়োজন শুধু যার যার অবস্থান থেকে সুবিধাবঞ্চিত শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো । তাঁদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়ানো ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*