ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন ও প্রাসঙ্গিক কিছু প্রশ্ন

ডা. এস. এ. মালেক, বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিষ্ট,

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের বিরোধী যে ফ্রন্ট নির্বাচনের পূর্ব মুহুর্তে গঠন করা হয়েছে; তার প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন। ১৯৬৯ সনের গণঅভ্যুত্থানের সময় যিনি
বঙ্গবন্ধুর সুনজরে পরে তৎকালীন আন্দোলনমুখী দল আ’লীগের অর্ন্তভূক্ত হন। উন্নত সামাজিক পরিবেশ এবং বড় ডিগ্রীধারী হওয়ায় তাকে আ’লীগ দলীয় নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করে। সবচেয়ে বড় যে ঘটনাটি তাকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে তুলে ধরেন তা হচ্ছে, ’৭১ এ পাকিস্তানে কারাবাস। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাথে গ্রেফতার করে তাকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়নি বরং নির্বাচিত সাংসদ হয়ে মুজিবনগরে না গিয়ে তিনি ঢাকায় অবস্থান করেছিলেন। সেই অবস্থানেই তিনি গ্রেফতার হন এবং পাকিস্তানে নিয়ে তাকে ভিন্ন কারাগারে রাখা হয়। পরবর্তীতে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আ’লীগের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করার পূর্বে তিনি বাংলাদেশ আ’লীগের একজন প্রভাবশালী নেতা হিসাবে দলে তার অবস্থান ছিলো। তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্ব›দ্বীতা করার জন্য শেখ হাসিনা দলীয় মনোনয়ন দেন এবং দেশব্যাপী তার পক্ষে প্রচারণা চালান। অনেকেই মনে করেন আ’লীগের বিভক্তিতে (বাকশাল ও আ’লীগ) তিনি বাকশাল বিরোধী ভূমিকা পালন করে আ’লীগের নেতৃত্বে থাকেন। কিছুদিন পর শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা হারিয়ে প্রথমে গণতান্ত্রিক ফোরাম এবং পরে গণফোরাম নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সেই থেকে তিনি আ’লীগের বিরোধী অবস্থানে থেকে কাজ শুরু করেন। সরকার বিরোধী আন্দোলনে তাকে কথা বলতে ও সক্রিয়ভাবে দেখা যায়। প্রত্যক্ষভাবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কথা না বললেও ইশারায় যেসব কথা-বার্তা বলা হয়ে থাকে, তার অর্থ দাঁড়ায় শেখ হাসিনা দেশ চালাতে ব্যর্থ এবং সেই নেতৃত্ব নিজেই নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির ও বিএনপির সাথে যুক্ত হয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছেন । তার সাথে যোগ দিয়েছেন জাসদের আ স ম রব ও প্রাক্তন ভিপি মাহামুদুর রহমান মান্না। ড. কামালকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বলা যাবে না। আর কাদের সিদ্দিকী কৃষকলীগ নেতা ও একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। এক সময় বঙ্গবন্ধুর ৪র্থ সন্তান দাবী করেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদী নেতা। সুলতান মনসুর এককালীন ডাকসুর ভিপি ও ’৭৫ এর পর প্রতিবাদী আন্দোলনে কাদের সিদ্দিকীর সহযোগী। আর মাহমুদুর রহমান মান্নার পরিচয় ইতিপূর্বেই দেওয়া হয়েছে। আসলে আ’লীগ থেকে ঐক্যফ্রন্টের এই ৪ জন নেতা প্রত্যেকেই স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি হিসাবে গণ্য করতে হবে। এদের প্রত্যেকেরই একসময় ভূমিকা ভালো ছিলো কিন্তু পরবর্তীতে এর ধারাবাহিকতা কেউই অব্যাহত রাখতে পারেনি। ড. কামালের পরিচয় হচ্ছে একজন প্রাক্তন আ’লীগ নেতা ’৭১ এ পাকিস্তানের কারাগারে আবদ্ধ। তারপর পরিচয় ছিলো গণতন্ত্রমুখী একটা ছোট দলের নেতা। আর এখন পরিচয় হচ্ছে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত অসহায়, ডুবন্ত বিএনপির কান্ডারীর ভূমিকায়। আর সেই বিএনপি জোটে রয়েছে ৭১’এর যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামী। একসময় ছিলো নিজ দলের ৫০০/১০০০ লোকের সামনে বক্তৃতা করতেন। এখন বিএনপির প্রায় হাজার হাজার লোকের সামনে বক্তৃতা দেন। বিএনপি জামায়াত যা শুনতে অভ্যস্ত তা হচ্ছে খালেদা জিয়া ও তারেকের মুক্তি। কিছুদিন পূর্বেও ড. কামাল এ ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন না।

ধানের শীষ কোন সময়ই তার প্রতীক ছিল না। ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে তিনি ধানের শীষে লড়ছেন। কত লোক যে ভুল করে ধানের শীষের জায়গায় নৌকায় ভোট দিবেন। প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতার একটা পরিচিতি থাকে। ড. কামাল হোসেনের পরিচয় ছিলো স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। আর ঐক্যফ্রন্টের নেতা হয়ে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন সাম্প্রদায়িক শক্তির, যুদ্ধাপরাধীদের, সন্ত্রাসীদের। এ ব্যাপারে ড. কামালের প্রধান বক্তব্য হচ্ছে তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। তার মতে দেশে কোন গণতন্ত্র নেই। আর যেসব শক্তির জোট প্রধান হিসাবে এগুলোর প্রতিষ্ঠা করতে চান, তারা হলো ’৭১ র মুক্তিযুদ্ধের শত্রæ, তাদের অনেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিশ্বাস করে না। এদেশে যতগুলো সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে তার হোতা তারা। তাই প্রশ্ন জাগে কি করে তিনি এই অপশক্তির উপর ভর করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চান। মনে পড়ে সেই দিনের কথা- যেদিন ড. কামাল হোসেন হোটেল ইডেনে কয়েকজন আ’লীগ নেতাকে নিয়ে শেখ হাসিনার দলীয় প্রধান হওয়ার ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তবে হালে পানি পাননি। তাদের সেই প্রতিবাদকে অগ্রাহ্য করে শেখ হাসিনা বিপুল ভোটে জয়ী হন। ড. কামালের শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মনোভাব সেই হোটেল ইডেনের থেকে পরিদৃষ্ট হয়। তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনাকে দলীয় সভাপতি কোনক্রমেই মেনে নিব না। আমি ডায়াসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থেকে স্বাক্ষী হিসাবে সব বলতে পারি। প্রথমে ছাত্রলীগকে ভাগ করে জাসদ নামক রাজনৈতিক দল প্রক্রিয়ায়ও ড. কামাল হোসেন গংদের সক্রিয়তা ছিলো। প্রগতিশীল বামপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের দলের বাইরে ঠেলে দিতে চেয়েছিলো। এ কাজে যারা মুখ্য ভূমিকা পালন
করেছিলেন; তাদের কেউ মারা গেছেন। আবার কেউ মন্ত্রীসভায় আছেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের কেউ বঙ্গবন্ধুর স্থলে ক্ষমতায় আসুক এটা কেউ চাননি। সেই বিরোধীতার জের ধরেই ড. কামাল হোসেন আজ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করছেন। যারা এখন তার সহযোগী বিশেষ করে আ’লীগ থেকে বেড়িয়ে তার সহযোগী হয়েছেন তারা ভ্রান্ত, হতাশাগ্রস্থ হয়েই তা করেছেন। শুধুমাত্র শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করবার জন্যই জামায়াত-শিবির ও সন্ত্রাসীদের সাথে হাত মিলিয়েছেন। আর দেশের মানুষদের বলছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করাই তার একমাত্র লক্ষ্য। বিগত ১০ বছরে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা

দেশকে কোন অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছেন, তা ড. কামাল বাংলাদেশের বাইরে পশ্চিমা রাষ্ট্রে বসেই টের পেয়েছেন। আর্ন্তজাতিক ফোরামে কী কারণে তাঁকে প্রায় ৪ ডজনের মতো সম্মাননা দিয়েছেন, তা কি তাকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। তিনি কি জানেন না, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বলে যে সেতুটি বাস্তবায়িত হচ্ছে তা কি তার অজানা। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু জাতীয় আয়, দারিদ্রতা হ্রাস, জাতীয় বাজেট কয়েকগুণ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ তা কি তিনি জানেন না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পখাতে যে উন্নয়ন হয়েছে, তা কি তার চোখে পড়ে না। সফ্ধসঢ়;টওয়্যার শিল্পে বাংলাদেশ যে অসাধারণ ভূমিকা রাখছে এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট যে আকাশে ওড়ছে, তা কি তার দৃষ্টিগোচর হয় না। অন্ধ হাতির মতো একরাশ দাসমাসি পিঠে নিয়ে মনে হয় চোখ বুজেই তিনি সব কথা বলছেন। তা না হলে শেখ হাসিনার মতো নেত্রীকে টেনে নামানোর চেষ্টা তিনি করছেন কেন। আর যাদের নিয়ে নামানোর চেষ্টা করছেন, তারা কী
প্রকৃতই তার নেতৃত্বে আস্থাশীল। তারা তাকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা কোন একটা জায়গায় বসাতে চান। সুষ্ঠুভাবে এই নির্বাচন সম্পন্ন হলে ড. কামালের কী অবস্থা হবে এ উপলব্ধি বিবেকবান জনগণের জানা আছে। তিনি বুঝতে পারলেন না শেষ জীবনে এসে এত বড় ভুল তিনি করেছেন। এ দেশে অনেক মানুষই ড. কামালকে শ্রদ্ধা করতেন। একজন বিবেকবান, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে তাকে সম্মান করতো। এখন তার অবস্থাটা কী? তিনি কী একবার ভেবে দেখেছেন, বিএনপি এবং জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা, তাকে কোথায় নিয়ে গেছেন। নব্য সমর্থক হিসেবে তিনি যাদের ওপর বিচরণ করছেন, তারা তো তাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে শ্রদ্ধা করতাম। রাজনীতিকে যেভাবে তিনি জনগণের কাছে স্বার্থপর হিসেবে চিহ্নিত হলেন এবং জীবনের শেষ সময়ে নিজের ভাবমূর্তি নষ্ট করলেন, তা এ দেশের ইতিহাসে আক্ষেপের বিষয় হয়ে থাকবে। বিএনপিতে ড. কামাল হোসেনের অবস্থান একেবারে নড়বড়ে। তিনি ভাসমান শ্যাওলা যেমন পানিতে মিশে থাকে বিএনপি’র নিকটও তার অবস্থা তদ্রæপ। তিনি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছেন সত্য তবে তাকে কুখ্যাত তারেক রহমানের পরামর্শেই তাকে চলতে হয়। এরচেয়ে লজ্জার কি থাকতে পারে। ড. কামাল হোসেনের জানা উচিত এ দেশের মানুষ ’৫৪ তে ভুল করেনি, ’৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভুল করেনি, এবারও ২০১৮ সালে সে ভুল করবে না। বিশ্ব নন্দিত বাংলাদেশের সবচেয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তি হচ্ছেন শেখ হাসিনা। যার অবস্থান জনগণের হৃদয়ের মনিকোঠায়। স্বার্থ উদ্ধারের জন্য কিছু লোক কোথায় কী বললো তা শেখ হাসিনাকে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে আটকে রাখতে পারবে না। জনগণের ভালো-মন্দ বুঝার ক্ষমতা রয়েছে; আর আছে বলেই আসছে আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে পুনরায় বিপুলভোটে বিজয়ী করে ক্ষমতায় আনবে, স্বাধীনতার
শত্রæদের শোচনীয় পরাজয় ঘটিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষা করবে।

আমি মনে করি, বঙ্গবন্ধুর ¯েœহভাজন কাউকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসম্মান করেন না। সবসময়ই যেকোনো সময় তাদের কাছে টেনে নেন। এর প্রমাণ মেলে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতির নির্বাচনেও। ড. কামালের সবকিছু ছাপিয়ে যে পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- তিনি বঙ্গবন্ধুর একান্ত আস্থাভাজন মানুষ। যার প্রমাণ মেলে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান তৈরীর দায়িত্বটি ড. কামালকে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। তার বর্তমান ভূমিকা জাতিকে হতাশ করেছে। প্রগতিশীল মানুষ হয়ে তিনি কোন প্রলোভনে বঙ্গবন্ধুর সহচর থেকে জামায়াতের সান্নিধ্যে এলেন। যে দলটি ও ফ্রন্টের নেতৃত্বে তিনি আছেন, তারা বার বার শেখ হাসিনাকে হত্যা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনি যাদের ওপর ভর করে, ক্ষমতায় যেতে চান, সে পথ বড় কঠিন। তিনি যতো তাড়াতাড়ি নিজের ভুল বুঝতে পেরে সঠিক পথে চলবেন, সেটাই হবে তার বুদ্ধিমানের কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*