বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিস এ দশটি বছর:অভিজ্ঞতা ও অর্জন।

আজ ৩০শে নভেম্বর, ২০১৮। আজ থেকে ঠিক দশ বছর পূর্বে গণ প্রজাতন্ত্রি বাংলাদেশ সরকারের একজন সেবক হিসেবে দেশ ও দেশের মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে মাঠের কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে ২৭তম বিসিএস এ কৃষি ক্যাডারের চাকুরিতে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করি। ২৭তম বিসিএসটি একটি ঘটনাবহুল নিয়োগ প্রক্রিয়া । দীর্ঘ আড়াই বছর অপেক্ষায় থেকে, একবার নয়, দুই দুইবার ভাইভা দেওয়ার পর অবশেষে পেলাম সেই সোনার হরিণ ।

বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিন্নাতুননেসা তাহমিনা বেগমের বিতর্কিত নিয়োগেও একই ক্যাডারে ছিলাম। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ নিয়োগপত্র প্রাপ্তির পূর্বেই কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান পরিবর্তনের সূত্রে সাহাদত হোসেন এর নিয়োগ ও ভাইভা বাতিলের মাধ্যমে আবারো দুঃচিন্তায় নিমোজ্জিত আমরা চাকুরি প্রত্যাশিরা। সেকি আন্দোলন, সেকি তোরজোড়। চেয়ারম্যান মহোদয় সিদ্ধান্তে অনড় । অতঃপর আবার ভাইভা! ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় আবার একই ক্যাডারে আবার সুযোগ পেলাম, তবে এবার মেধা তালিকায় একটু এগিয়ে আসলাম। প্রথম পোস্টিং ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলা। বুকভরা আশা নিয়ে যোগাযোগ করলাম। শুরুতে অফিস ও সুযোগ সুবিধা দেখে কিছুটা হতাশা কাজ করলো। কারন সদ্য বেশ ভালো একটা চাকুরি ছেড়ে (উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড) তেমন আশানুরূপ প্রতিফলন দেখতে পাইনি। একটা জীর্নশীর্ন এসকট মটর সাইকেল নিজের পকেট ধেখে প্রায় ছয় হাজার টাকা খরচ করে ঠিক করলাম। কারন কর্মক্ষেত্র মাঠ ও ঘাট, কৃষি ও কৃষক, এ প্রান্তর থেকে ও প্রান্তরে।

ধীরে ধীরে মন শুধু মানিয়েই নিলাম না, বেশ উপভোগ্য ও হয়ে উঠলো । পরবর্তী ঠিকানা মানিকগঞ্জের শিবালয়। পদ্মার পাড়, আলোকদিয়ার চর, লোকালয়, মিষ্টি দই, আহহ। তখনকার ইউএনও ছিলেন আমার দেশি । দায়িত্ব দিলেনঅতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি এর সভাপতি হিসেবে কাজ করার। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা । প্রথমে বিব্রত হলেও পরে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। শেষ হলো। সে সময় আরো একটা উল্লেখযোগ্য কাজ করতে হয়েছিল । শিবালয়স্ত সকল কৃষকদের একটা ডাটাবেজ তৈরি করা ও সকল কৃষকদের সঞ্চয়ী মনোভাব তৈরির উদ্দেশ্যে সরকারের কৃষি মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে দশ টাকায় রাষ্টায়ত্ব সিডিইল ব্যাংক গুলোতে সঞ্চয়ী হিসাব খোলা। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হিসেবে একদল উপসহকারী কৃষি অফিসারদের সহযোগিতায় সফলতার সহিত সেটা সম্পন্ন করলাম। সে সময় আমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্যার ছিলেন আমার সম্মানিত মিজান স্যার । এরপর আবার যাত্রা পরিবর্তন । এবার ঠিকানা ঢাকার কেরানীগঞ্জ । স্বপরিসরের কৃষি হলেও কেরানীগঞ্জের কৃষি ছিলো লাভজনক কৃষি । আটি বাজার, রুহিতপুর, কোনা, আব্দুলাপুর সহ পাশ্ববর্তী ইউনিয়ন গুলোই ছিলো রাজধানী ঢাকার সবজি সরবরাহকারী । অসাধারন সতেজতার সবজির পাশাপাশি মুন্সিগঞ্জের সাথে তাল মিলিয়ে আলুর উৎপাদন। ছাঁদ বাগানের প্রচলনো বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল সে সময় কেরানীগঞ্জে।

এরপর আমার যাত্রা আমার চাকুরি জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের স্থানে। খামারবাড়িতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে একটি অন্যতম বড় প্রকল্প ( প্রায় একশত আটাত্তর কোটি টাকা) উপজেলা পর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য কৃষক প্রশিক্ষণ প্রকল্প (2য় পর্যায়)। আমার কর্মজীবনে যা কিছু দক্ষতা অর্জন করেছি, তার হাতে খড়ি এই প্রকল্পের সম্মানিত প্রকল্প পরিচালক এস তাসাদ্দেক স্যারের হাত ধরে। বাংলাদেশের একশ ছয়টি উপজেলায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম । কৃষকদের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে উপজেলায় আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ ও কৃষি উপকরন কৃষকের দোরগোড়ায় পৌছানোর জন্য যানবাহন সুবিধা প্রদান। তিন বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় সরকারের অত্যন্ত সফল প্রকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এই প্রকল্পটি। প্রকল্পে কাজের সুবাদে বাংলাদেশের অনেকগুলো উপজেলা, বিশেষকরে উত্তরবঙ্গের উপজেলাগুলো পরিদর্শনের সুযোগ পাই। খুব উপভোগ করেছিলাম এই স্থানটি।

এরই মাঝে দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়ে চলে এলাম চার বছরের জন্য পিএইচডি করতে। আর এ সবাই সম্ভব হয়েছে উপর আল্লাহ্পাকের রহমত ও এই চাকুরির সুবাদে । ভীষণ ভাবে কৃতজ্ঞ এই চাকুরিটার কাছে। জীবনের আর যতদিন বেঁচে থাকবো সম্পূর্ণ মন ও মনন দিয়ে চেষ্টা করবো আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্ঠা ও সততার সহিত পালন করার, আজকের দিনে এই হোক আমার নিজের কাছে নিজের অঙ্গীকার । মহান রাব্বুল আলামিন আমাকে যেন সেই তৌফিক দান করেন। আমিন।

শামীম আহমেদ, পিএইচডি গবেষক, দক্ষিণ কোরিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*