ক্যান্টন থেকে দেখা

লেখকঃ রাশেদুল ইসলাম

এবার চীন দেশে যাওয়া হচ্ছে আমার । এই ২০১৮ সনে । এখন আগস্ট মাস । এ মাসের চলতি সপ্তাহেই যাওয়ার কথা । ১৯৯৭ সনেও একবার চীন যাই আমি । চীনের গ্রেটওয়াল, নিষিদ্ধ নগরী, সামার প্যালেস –এসব ঐতিহাসিক স্থান তখনই দেখা আমার । তারপরও চীন যাওয়ার কথা শুনে আমার ভালো লাগে । চীনের পরিবর্তন আমাকে টানে । আমি জানি নব্বই দশকের সেই চীন, আর আজকের চীন এক নয় । আকাশ- পাতাল ব্যবধান । এ সময়ের মধ্যে চীনের অর্থনীতি একেবারে ওলটপালট হয়ে গেছে । এখনকার চীন দেশের ভিতরের খোলনলচে বদলে ফেলেছে শুধু নয়; গোটা বিশ্ববাজার দখলে নিয়েছে যেন ! আমি আলো ঝলমল বেইজিং এর কথা কল্পনা করি । কিন্তু, ভ্রমণসূচী দেখে আমার টনক নড়ে । না, বেইজিং নয় । আমাদের গন্তব্য গোয়াংঝু । গোয়াংঝু আমার পরিচিত নগরী নয় ।জায়গাটা চিনতে গুগোল সার্চ করি আমি । জানতে পারি গোয়াংঝুর পুরাতন নাম ক্যান্টন । ক্যান্টন নাম দেখেই আমি চমকে উঠি । এক ধরণের স্মৃতিকাতরতা (nastalzia) ভর করে আমার মধ্যে । আমি আমার ছেলে বেলায় ফিরে যাই ।

পাঠ্যপুস্তকের বাইরে আমার পড়াশুনা খুব ছোটকাল থেকেই । ষষ্ট শ্রেণিতে পড়াকালে একটা ছেঁড়া ম্যাগাজিন আমার হাতে আসে । সেখানে চীনের জাতীয় লেখক লু সান(Lu Xun) এর একটা লেখা পাই
আমি। চড়ুই পাখির উপর সে লেখাটি আমার মনে দাগ কাটে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গোরা’ উপন্যাস যখন পড়ি, তখন আমি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র । একজন কলা বিক্রেতার ঝুড়ি থেকে একটার পর একটা
কলা খাচ্ছেন গোরা; নিমিষেই একঝুড়ি কলা শেষ – ‘গোরা’ উপন্যাসের কথা এলেই আজও আমার স্মৃতিতে গোরার কলা খাওয়ার দৃশ্য ভেশে ওঠে । আমার জানামতে ‘গোরা’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অনবদ্য উপন্যাস। তৎকালে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে যে ধর্মীয় মতভেদ দেখা যায়, তার প্রতিফলন ঘটেছে গোরা উপন্যাসে । নায়ক গোরা গোঁড়া হিন্দুবাদী । আমার তখন এসব তত্ত্ব বোঝার বয়স হয়নি। হয়ত সে কারণেই কিশোর মনে গেঁথে যাওয়া গোরার কলা খাওয়ার দৃশ্য আজও আমার মনে আছে । তবে, এগুলো সব আমার অপরিণত বয়সের পড়া । সত্যই লু সানের চড়ুই পাখির উপর কোন লেখা আছে কিনা; বা ‘গোরা’ উপন্যাসে গোরার কলা খাওয়ার দৃশ্য আছে কি না–বড় হয়ে তা যাচাই করে দেখা হয়নি আমার। আসলে যখন আমার সবকিছু বোঝার বয়স হয়েছে; তখন আমি পড়াশুনা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি। তাই, পৃথিবীর পুরানো ইতিহাস আমি যত জানি; সে তুলনায় নতুন ইতিহাস আমার তেমন জানা নেই বললেই চলে । সেদিক থেকে আমি একজন অপূর্ণ জ্ঞানের মানুষ। অবশ্য এটা আমার এখানে লেখার বিষয় নয় ।

আমি বলছিলাম, আমার ছেলেবেলার বই পড়ার কথা । সে সময় একটা বই আমার কিশোর মনের চিন্তা- চেতনা একেবারে ওলটপালট করে দেয়। বইটির নাম ‘পথের দাবী’। লেখক অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এই ‘পথের দাবী’র নায়ক সব্যসাচীর মুখে আমি চীনের ক্যান্টনের কথা শুনি। ভারতে ইংরেজ শাসনের অবসান তাঁর (সব্যসাচী) জীবনের একমাত্র ব্রত । ইংরেজ বিচারকের দেয়া
মৃত্যুদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে পৃথিবী চষে বেড়ান তিনি। নিজের মৃত্যু অথবা ভারতের স্বাধীনতা–আর কোন বিকল্প নেই তাঁর কাছে। এই নায়ক সব্যসাচী ইংরেজ ভক্ত ভারতীকে ইংরেজদের প্রকৃত স্বরূপ
বোঝাতে চান । সেখানে ক্যান্টন এর উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি । বেনিয়া ইংরেজ ভারতে আসন গেড়েছে। মীর জাফরদের সহায়তায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ইস্ট ইনডিয়া কোম্পানি । এখন লক্ষ্য চীন ।ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত দেখা করেন চৈনিক রাজদরবারে । রাজা সাধু প্রকৃতির মানুষ। অতীব দয়ালু । তাঁর দেশে কোন কিছুর অভাব নেই। প্রজারা সুখে আছে। ইংরেজ অনেক দূর থেকে আসা মেহমান। তাঁরা যদি ব্যবসা করে খায়- অসুবিধা কি ? মহান রাজা ক্যান্টনে ইংরেজদের ব্যবসা করার অনুমতি দেন। চীন সম্রাটের উদারতা মোক্ষম কাজে লাগায় ইংরেজ। নিজেদের কলোনি রাজ্য ভারতে কৃষকদের আফিম চাষ করতে বাধ্য করে তাঁরা। সেই আফিম জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে যায় ক্যান্টনে। কয়েক বছরের মধ্যেই ক্যান্টনসহ উপকুলীয় অঞ্চলে মাদকাসক্ত লোকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ২০ লক্ষে। এসব অঞ্চল খুন, রাহাজানি ও নৈরাজ্যের আখড়ায় পরিণত হয়। চীন সম্রাট বাধ্য হন মাদকদ্রব্য আমদানী নিষিদ্ধ করতে। বাজারে থাকা সব আফিম বাজেয়াপ্ত করেন তিনি। সম্রাটের এই আদেশে ইংরেজদের ১৩০০ মেট্রিক টন আফিম বাজেয়াপ্ত হয়। এতে ব্রিটিশ রানী ক্ষুব্ধ হন। চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। ইতিহাসে এ যুদ্ধ আফিম যুদ্ধ নামে পরিচিত। যুদ্ধে পরাজিত হয় চীন । অসম নানকিং চুক্তি (১৮৪২ )’র মাধ্যমে প্রথম আফিম যুদ্ধের অবসান হয় । পরাজিত চীনকে বাজেয়াপ্তকৃত আফিমের দাম, ক্ষতিপূরণ, যুদ্ধের ব্যয় সব মিলিয়ে ২১ মিলিয়ন সিলভার ডলার প্রদান করতে হয় বিজয়ী ইংরেজকে । এছাড়া হংকং দ্বীপটি ইংরেজদের দক্ষিনা হিসাবে দেয়া ছাড়াও, ৫টি বন্দরনগরীতে ব্যবসার অনুমতি দিতে হয় চীনকে। এখানেই শেষ নয় । ইংরেজ মাদক ব্যবসাকে বৈধতা দেওয়া এবং শুল্কমুক্ত ব্যবসার জন্য চীনের বিরুদ্ধে ১৮৫৬ সনে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ শুরু করে । সে যুদ্ধে ফ্রান্স অংশ নেয়। দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধেও চীন পরাজিত হয়। পরাজিত চীন ইউরোপীয় দেশের জন্য লুটপাটের একটা স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয় । বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘদিনের বৃহত্তম ও স্থিতিশীল চীনের অর্থনীতিতে ধ্বস নামে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর । ঐতিহাসিকগণ চীনে ইংরেজ আগমনের পরবর্তী একশত বছর (১৮৩৯-১৯৩৯) চীনের জন্য অপমানকর শতবর্ষ (Century of Humiliation) হিসাবে গণ্য করেন । অথচ, গোটা ঘটনা ঘটে চীনের একজন দয়ালু রাজার উদারতা প্রদর্শনের কারণে । তাহলে বিদেশী মেহমানদের প্রতি কোন দেশ কি মানবিক আচরণ করবে না ?

চীনের সভ্যতা অনেক প্রাচীন । অনেকের জন্য ঈর্ষনীয় । পৃথিবীর যে ৪ টি মৌলিক আবিস্কার মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সে ৪ টি আবিষ্কারই চীনের । কাগজ, মুদ্রণযন্ত্র, কম্পাস ও গান পাওডার- সেই ৪ টি আবিষ্কারের নাম । অথচ, এই ৪ টি আবিষ্কারের সুফল ভোগ করে ইউরোপ । কম্পাস ব্যবহার করে সমুদ্র জয় করে তারা । কাগজ ও মুদ্রণযন্ত্র ব্যবহার করে রেনেসাঁ বিপ্লব ঘটে ইউরোপে । চীনের আবিষ্কৃত গোলাবারুদে বলীয়ান ইংরেজ, চীনের কম্পাসের দিক নির্দেশনায় চীনে গিয়ে হাজির হয় । চীনের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায় তাঁরা । কিন্তু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীনের প্রেক্ষাপট বদলে যায় । বিপ্লবী মাও সে তুং চীনকে একটা ভিন্ন মর্যাদায় দাঁড় করান । যদিও মাও সে তুং এর চীন এবং দেং জিয়াও পিং এর চীন এক নয় । তারপরও এই ভিন্নতা চীনের পিছনে তাকানো নয় । শুধু এগিয়ে যাবার জন্য । বর্তমানে সার্বিক বিচারে সফলতম একটি দেশের নাম চীন ।

ক্যান্টন ছাড়াও আমাদের ভ্রমণসূচিতে আছে শেনজেন, কুনমিং, হংকং- তারপর থাইল্যান্ড হয়ে স্বদেশ । হংকং এখন ব্রিটিশ হংকং নয় । চীনের অংশ । থাইল্যান্ড মানে আমার ছেলেবেলায় পড়া শ্যামদেশ । শ্যামদেশের কথা পরে । আমি আসলে ফিরে যেতে চাই ক্যান্টনে । প্রায় দুইশত বছর আগের ক্যান্টনে । দুইশত বছর আগের ক্যান্টন থেকে আমি বর্তমানকে দেখতে চাই । মানুষের নৃশংসতা, লোভ, শঠতা, প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার শেষ পরিণতি আমি জানতে চাই । দয়া, উদারতা, মায়ামমতা- এসব মানবিক গুণাবলি কি শুধুই কথার কথা ? ব্যবহারিক কোনই মূল্য নেই ? আমি জানিনে আজকের আলোঝলমল গোয়াংঝুতে সেদিনের ক্যান্টনের কোন চিহ্ন আছে কি না । তারপরও আমি দেখতে চাই । ক্যান্টন থেকে দেখতে চাই ।

৫ আগস্ট, ২০১৮ । আমি ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে । গোয়াংঝুর পথে । ফ্লাইটের সময় রাত ১২.৫০ ।চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স এর যাত্রী আমি । ৩ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের পথ । তারমানে ৬ আগস্ট । সকাল ৬.২৫ । চীনের গোয়াংঝুতে আমি ।  আমার ছেলেবেলায় পড়া সেই ক্যান্টন । আমাদের ভ্রমণ নিরাপদ হোক – এই দোয়া চাই সকলের ।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*