পাগলা মামা(ছয়)

রাশেদুল ইসলাম : একটা বিদঘুটে নম্বর থেকে ফোন । দেশী না বিদেশী বোঝার উপায় নেই । এ ধরণের ফোন ধরা উচিত,  কি উচিত নয়, বুঝতে বুঝতেই রিংটোন শেষ । দ্বিতীয়বার কল আসতেই রিসিভ করি আমি । ওপাশে ভরাট  কণ্ঠস্বর । আমি নিজের অজান্তেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াই । পাগলা মামা । কোন ভূমিকা ছাড়াই কথা বলেন তিনি । কথার বিরতি  হতেই আমি কিছু বলতে চাই । লাইন কেটে দেন তিনি । সেই বিদঘুটে নম্বরে কয়েকবার রিং করি আমি । কোন লাভ নেই । এক ধরণের শব্দ হয়েই লাইন কেটে যায় । হতাশ হয়ে  চেয়ারে বসে পড়ি আমি । পাগলা মামার কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করি আমি । তাঁর কথা যতটা বুঝেছি – শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় পক্ষের মঙ্গলবার রাত পাগলা মামা ঢাকা চিড়িয়াখানায় কাটাতে  চান । তিনি সুন্দরবনে অনেক রাত থেকেছেন । কিন্তু, চিড়িয়াখানার মত বহুবিচিত্র প্রাণী একসাথে দেখার সুযোগ সেখানে নেই । তাই, তিনি চিড়িয়াখানায় এক রাত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । আমার সাহায্য চান  তিনি ।

মাঝে মাঝে পাগলা মামাকে আমার অসহ্য মনে হয় । তিনি চিড়িয়াখানায়  যেতে চান, ভালো কথা । কিন্তু, রাতের বেলা কেন ? আবার নির্দিষ্ট একটা  রাত কেন ? শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় পক্ষের মঙ্গলবারের রাত, কি বিশেষ কোন রাত ? রাতের মধ্যে আবার  পার্থক্য কি ? বিশেষ রাত কিভাবে বুঝব ? ছোটকালে গ্রামের প্রায় সব বাড়িতে পঞ্জিকার ব্যবহার দেখেছি ।  হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে পঞ্জিকার ব্যবহার এখনও আছে । তবে, মুসলমানদের মধ্যে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে । ঢাকা শহরে কি পঞ্জিকা পাওয়া যায় ?  একটা পঞ্জিকা পাওয়া গেলে শ্রাবণ মাসের দ্বিতীয় পক্ষের রাতের বিশেষত্ব জানা যেত । কিন্তু, চিড়িয়াখানার জীবজন্তুর সাথে এ রাতের কি সম্পর্ক ? আমার কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায় । আমি পাগলা মামাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি । কিন্তু,  যতই ভুলতে চাই, ততই মাথায় জেঁকে বসেন পাগলা মামা । হটাৎ, ঈশপের কথা মনে পড়ে আমার । পাগলা মামা কি ঈশপ হতে চান ? ঈশপের কথা আমি পাগলা মামার কাছে প্রথম শুনি । আজ এতো বছর পর আবার মাথায় আসে ঈশপ । দুই হাজার ছয়শত বছর আগের ঈশপের যুগে ফিরে যাই আমি ।

আমার ছাত্রজীবনের কথা । পাগলা মামা বলেন, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য  নিজের সহজাত বিচার বুদ্ধিই যথেষ্ট । এই সহজাত বিচার বুদ্ধি দিয়েই একজন মানুষ পারিপার্শ্বিক ঘটনার ভালোমন্দ দিক বিচার করতে পারে । এজন্য শিক্ষিত হওয়া মোটেই  জরুরি নয় । পবিত্র কোরআনেও একই কথা বলা হয়েছে । যে আল্লাহ্‌কে বিশ্বাস করতে চায়, তার কোন অলৌকিক ঘটনা দেখার প্রয়োজন নেই । আশেপাশের ঘটনা থেকেই সে, আল্লাহ্‌  বিশ্বাসী হতে পারে । হঠাৎ প্রশ্ন করেন মামা, ‘তুই কি ঈশপের নাম জানিস’ ? ঈশপের কোন গল্প কি তুই পড়েছিস’ ? আমি ঈশপের নাম মামার মুখেই প্রথম শুনি । গল্প পড়ার তো প্রশ্নই ওঠে না । এ বিষয়ে উত্তর না দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ ।  আমি চুপচাপ থাকি । মামা বলতে থাকেন, ‘ঈশপকে উপকথার জনক বলা হয় । পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প বলিয়ে ব্যক্তির নাম ঈশপ । প্রায় দুই হাজার ছয়শত বছর আগে প্রাচীন গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি । বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি । দাসপ্রথার যুগে ঈশপের জন্ম । তিনি  দাস পরিবারের সন্তান । ফলে জন্মগতভাবে ক্রীতদাস তিনি । লেখাপড়া জানার কোন সুযোগ হয়নি তাঁর । পভীর পর্যবেক্ষণ দৃষ্টি ছিল তাঁর । মানুষ ও পশুপাখির আচরণ লক্ষ্য করে গল্প বানাতেন তিনি । নীতিকথার গল্প । এই নীতিকথার গল্প শুনিয়ে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন তিনি ।  তাঁর নীতিকথার গল্প এমন জনপ্রিয় হয় যে, সক্রেটিস, এরিস্টটল বা প্লেটোর মত অন্যান্য দার্শনিকগনও তাঁদের আলোচনায় ঈশপের কথা আনেন । সক্রেটিস হেমলক পানের আগেও ঈশপের নীতিবাক্য স্মরণ করেন । ঈশপের গল্পে মুগ্ধ হয়ে তাঁর মালিক আয়াদমন তাঁকে দাসজীবন থেকে মুক্তি দেন । তিনি স্বাধীন নাগরিক হওয়ার সুযোগ পান ।  তাঁর গল্পে মুগ্ধ হয়ে লিডিয়ার রাজা ক্রোসাস তাঁকে রাজদরবারে উচ্চপদে নিয়োগ দেন । পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই, যে দেশের মানুষ ঈশপের গল্প জানে না’ । মামা একটু দম নেন । ‘আমাদের দেশে কি ঈশপের গল্প আছে’ ? আমি প্রশ্ন করি । ‘অবশ্যই আছে । এ গল্পগুলো তুইও জানিস’ । মামা বলতে থাকেন, ‘ ঈশপের গল্পগুলো অবশ্যই তোদের ক্লাসে পড়ানো হয় । কিন্তু, অনেক শিক্ষক আছেন, এসব গল্পের সূত্র কখনও বলেন না। এ কারণে,  তোরা ঈশপের নাম জানিসনে । এটা ন্যায়সঙ্গত নয় । শিক্ষকগন যদি গল্পের সূত্র উল্লেখ করে গল্প বলেন, তাহলে ছাত্রছাত্রীরা গল্পের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারে । মনে রাখতে পারে । আসলে ঈশপের গল্প শুধু শোনার জন্য নয় । এসব গল্প মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের জন্য । আমাদের দেশে ঈশপের গল্পগুলো কেবলমাত্র শিশুতোষ গল্প মনে করা হয় । এ গল্পের শিক্ষা যে, বড়দের জীবনে প্রয়োগের জন্য –এভাবে দেখা হয় না ।

আমি মনে মনে অধৈর্য হই । আমি গল্প জানি;  অথচ, গল্পকারের নাম জানিনে; এটা আমার জন্য  লজ্জার । আমি মামাকে উদাহরণ দিয়ে ঈশপের গল্প বলার জন্য অনুরোধ করি   । মামা ঈশপের গল্প বলেন ।

গল্প –একঃ   মিথ্যাবাদী রাখাল

এক রাখাল বনের ধারে ভেড়া চরাত । মাঝে মাঝে মজা করার জন্য সে বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করত । গ্রামের লোকজন ছুটে এলে,  সে হো হো করে হাসত । এতেই মজা পেত সে । একদিন সত্য সত্যই তার ভেড়ার পালে বাঘ পড়লো । বাঘের থাবায় আক্রান্ত হয়ে বার বার বাঘ বাঘ বলে চিৎকার করল সে  । মানুষের সাহায্যের জন্য কান্নাকাটি করলো । কিন্তু, সেদিন কেউ তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলো না । অসহায় মৃত্যু হোল সেই রাখালের ।

নীতিকথাঃ মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না । তাই, কখনও মিথ্যা কথা বোলো না ।

গল্প –দুইঃ   সোনার ডিমপাড়া হাঁস

এক লোকের একটি হাঁস ছিল । প্রতিদিন একটা করে সোনার ডিম পাড়তো  সেই হাঁস । দিনে একটা ডিম পেয়ে মোটেই খুশী ছিল না লোকটা । হাঁসের পেটে যত ডিম আছে;  একসাথে পাওয়া গেলে রাতারাতি ধনী হওয়া যেতো । এই ভেবে লোকটা ছুরি দিয়ে হাঁসটির পেট চিরে ফেলে  । কিন্তু, পেটের নাড়িভুঁড়ি ঘেঁটে লোকটা শুধু একটা ডিম পায় । সোনার ডিম । কিন্তু, হাঁসটা সাথে সাথে মারা যায় । লোকটা তার বোকামির   জন্য কাঁদতে থাকে ।

নীতিকথাঃ অতিলোভ মানুষের দুঃখের  কারণ হয় । তাই, বেশী লোভ করো না ।

গল্প –তিনঃ  বানরের পিঠা ভাগ

একটা গাছের নিচে  পিঠা পড়ে ছিল । দুটি বিড়াল তা কুড়িয়ে  পায় । দুজনেই সেই পিঠার মালিকানা দাবী করে  তারা । এক পর্যায়ে বিড়াল দুটির মধ্যে মারামারি শুরু হয় । সেই গাছের ডালে ছিল একটা বানর । সে নিচে এসে তাদের বিবাদের কারণ জানতে চায় । সব শুনে বানর সেই পিঠা বিড়াল দুটির মধ্যে ভাগ করে  দিতে চায় । বিড়াল দুটি খুশী হয় । তারা বানরকে বিচারক মানে । বানর পিঠাগুলো দুভাগে ভাগ করে । তারপর এক ভাগে একটু বেশী হয়েছে বলে, সেখান থেকে একটুকরো পিঠা নিয়ে সে নিজের মুখে নেয় । এরপর অন্য ভাগে বেশী হয়েছে বলে,  একই ভাবে সেখান থেকে পিঠা নিয়ে সে নিজের মুখে পোরে । এভাবে এভাগ, ওভাগ থেকে পিঠা নিতে নিতে এক সময় সব পিঠা বানর নিজেই খেয়ে ফেলে । বিড়াল দুটো বোকার মত তাকিয়ে থাকে।

নীতিকথাঃ  ধূর্ত এবং অবিবেচক কাউকে বিচারকের আসন দিও না ।

গল্প –চারঃ  ক্ষমতার লড়াই

এক বনে এক সিংহ এবং একটা বাঘ ছিল। দুজনেই  নিজেকে বনের রাজা দাবী করত । এ নিয়ে অনেক সমস্যা । একদিন  ঠিক হল, তাদের মধ্যে শক্তির পরীক্ষা হবে । যে বেশী শক্তিশালী; সেই বনের রাজা হবে ।  শুরু হয় লড়াই । বন কাঁপিয়ে হুংকার দেয় বাঘ । সিংহ হামলে পড়ে বাঘের উপর । হাড্ডাহাড্ডি লড়াই । বেলা গড়িয়ে বিকেল । দুজনেই নির্জীব প্রায় । মৃত ভেবে একঝাক  শকুন নেমে আসে আকাশ থেকে । মৃতপ্রায় বাঘ সিংহের দিকে তাকায় । তারা বুঝতে পারে তাদের মৃত্যু মানে, শকুনের রাজত্ব শুরু । সাথে সাথে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সিংহ  । বিবাদ ভুলে যায় তারা । শুন্যে মিলিয়ে যায় শকুন ।

নীতিকথাঃ    ক্ষমতার জন্য এমন লড়াই  করোনা; যাতে অন্য কারো হাতে  সব ক্ষমতা চলে যায় ।

আমি বলি, ‘এসব গল্প আমার জানা’ । ‘আমি আগেই বলেছি, এসব গল্প তোর জানা । কিন্তু, তুই কি জানতিস এগুলো ঈশপের গল্প’ ?- মামা বলেন । আমি মাথা নাড়ি । ‘না,  জানতাম না’ ।

কিন্তু, ঈশপের গল্প আমার বিষয় নয় । আমার চিন্তার বিষয় পাগলা মামা । পাগলা মামা  শ্রাবণ মাসের ১৬ তারিখ, মঙ্গলবার রাত ঢাকা চিড়িয়াখানায় থাকতে চান । রাতে চিড়িয়াখানায় থাকা কি সম্ভব ? থাকা তো সম্ভব । কিন্তু, সেখানে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া কি সম্ভব ?  এ অনুমতি কে দেবেন ? এ ব্যাপারে আইনের কোন বাঁধা আছে কি ? কার সাথে কথা বলি আমি ? নিজেকে কেমন যেন অসহায় মনে হয় আমার !

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*