ভিআইপি বনাম অলৌকিকতা | পর্ব-১ | একটি ভ্রমন অভিজ্ঞতা |

লেখক : ড. নূরুল করিম, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য ।

শুরু করতে চাই আমার মায়ের বলা একটি উক্তি দিয়ে । মা বলতেন, ‘‘বাবা উচু অবস্থানের অধিকারী হওয়া মহত্ব নয়, বরং অবস্থান থেকে ভাল কিছু করাই হলো মহত্ব ।’’ তাই আমি সবসময় মায়ের দেয়া এ শিক্ষাটি অনুসরন করার চেষ্টা করি ।

সমগ্র বাংলাদেশ ব্যাপী আমার চলমান কর্মসূচীগুলির অংশ হিসেবে ২০১৬ সালের জানুয়ারিত আমি বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পটুয়াখালী ও বাউফল প্রেস ক্লাবের কম্পিউটার হস্তান্তর এবং বাউফল উপজেলায় একটি একাডেমী উদ্বোধন করতে গিয়েছিলাম, একাডেমীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইসলাম করিম ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে।

কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক, তিন জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং পটুয়াখালীর একজন গাইডসহ ভোর ৫ টায় আমরা গুলশান থেকে বাউফলের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওয়ানা হলাম ।রাস্তায় খুব স্বল্পসংখ্যক গাড়ি ছিল। আমরা যখন হাতিরঝিল অতিক্রম করছিলাম তখন ঢাকা মাত্র গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠছিল ।ঢাকা শহরের ভূসৌন্দর্য বৃদ্ধিতে হাতিরঝিল এক চমৎকার সংস্করন ।ব্রীজে আলো আঁধারির এক ধুসর ছায়ায় আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি বাংলাদেশের ঢাকা শহরে আছি । এ অদ্ভুত সৌন্দর্য আমার স্মৃতি পটে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, এবং জাপানের কিছু স্থানের কথা মনে করিয়ে দিল।রাস্তা ছিল প্রায় ফাঁকা। আমি ভাবছিলাম কি সুন্দর আমাদের এ দেশ ।আমারা যদি সুন্দর স্বপ্ন দিয়ে সুসংগঠিতভাবে সব কিছু করতে পারতাম তাহলে আমাদের এ দেশ অনেক সুন্দর ও আনন্দদায়ক হতো।

এরই মধ্যে আমরা মাওয়া ফেরী ঘাটের কাছে পৌঁছে গেলাম ।পদ্মা নদী অতিক্রম করার জন্য আমরা প্রথম ফেরিটি ধরতে পারব কি না তা নিয়ে আমাদের ড্রাইভার চিন্তিত ছিলেন । আমরা ভাগ্যবান ছিলাম যে ফেরিটি একজন ভিআইপি আসার জন্য অপেক্ষা করছিল কারণ তাদের আগেই জানানো হয়েছিল ।ফেরীটি ছিল প্রায় গাড়িপূর্ন।শুধু একটু জায়গা খালি ছিল যদি ভিআইপি’র সঙ্গে একাধিক গাড়ি আসে তার জন্য ।অবশেষে ভিআইপি আসলেন । আমি আমাদের ড্রাইভারকে বললাম ভিআইপিকে অনুসরন করতে ।কিন্ত আমাদের ড্রাইভার দ্বিধান্বিত হলেন এবং একটু ভয়ও পাচ্ছিলেন ।পরে আমি জোর দিয়ে বলায় তিনি ভিআইপিকে অনুসরন করলেন ।নিরাপত্তা কর্মী আমাদেরকে ফেরীতে উঠতে দিলেন । সম্ভবত তিনি বুঝতে পারেননি যে আমরা ভিআইপ’র সাথের নয় । আমি আমার গাড়িতে বসে পদ্মা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম, আমি ভাবছিলাম, বাংলাদেশে যদি আপনি ভিআইপি হন তবে আপনি কত ভাগ্যবান ।

আমি নদীর তীরে লোকদের দেখেছিলাম, কঠোর পরিশ্রম করছে, তাদের মনে কোন ভয় নেই, খুব প্রাণবন্ত মেজাজে এবং আনন্দে গান গাইছে, তারা নদীর তীরেই তাদের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণ করেছে, নদীর সাথে রয়েছে তাদের ভাল সম্পর্ক, তারা নদীর পানি পান করে, নদীতে গোসল করে ।তাদেরকে বিল পরিশোধ করার বিষয়ে চিন্তা করতে হয়না । কারন তাদের কোন বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, নেই উপভোগের কোন আধুনিক যন্ত্রপাতি । এসবের পরিবর্তে তারা প্রকৃতি থেকেই সবকিছু ভোগ ও উপভোগ করছে ।কখনও কখনও প্রমত্তা পদ্মা তাদের উপর বিরক্ত হয় এবং তাদের তৈরি সবকিছু ধ্বংস করে দেয়, তারা বেঁচে থাকার জন্য আবার যুদ্ধ করে। আমি এই মানুষদের জীবনের সঙ্গে ইংল্যান্ডের জীবন তুলনা করছিলাম । উন্নত দেশ বলি আর দরিদ্র দেশ বলি বেঁচে থাকার জন্য এ দু’য়ের মধ্যে  আমি গুরুত্বপূর্ন সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছিলাম ।কিন্ত কোন জীবনটি সত্যিই উৎকৃষ্ট এমন একটি উপসংহারে আসতে পারিনি।

কিছুক্ষন পর আমরা পদ্মা নদীর অন্য পাশে পৌঁছলাম এবং আমাদের ড্রাইভার বিচক্ষনতার সঙ্গে ভিআইপির আগে আমাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল আমাদের গন্তব্য বাউফল, পটুয়াখালী, বরিশালের দিকে । পথ বরাবর বয়ে যাওয়া নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বরিশাল শহর অতিক্রম করছিলাম। দু’টি নাম মনে পড়ে গেল একজন এ কে ফজলুল হক এবং অন্যজন জীবনানন্দ দাশ । উভয়ই বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। বরিশালের পূর্ব নাম চন্দ্রদীপ। এ কে ফজলুল হককে বলা হয় বাংলার বাঘ এবং আমাদের বাংলাদেশি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালনের মাধ্যমে তিঁনি আমাদের ইতিহাসে এবং আমাদের বাংলা ও মুসলিম সংস্কৃতিতে একটি বিশাল অবদান রেখে যান । রবীন্দ্রনাথের পরে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন বাংলা কবিতায় নতুন ধারার আধুনিকতার সৃষ্টিকর্তা । তিনি একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ভাষার জন্ম দিয়েছিলেন এবং আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রেখে গেছেন।

অবশেষে আমরা বাউফল উপজেলায় পৌঁছলাম যেখানে অনেক মানুষ আমাদের সাথে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং আমাদের সহযোগী হয়ে যেখানে মসজিদ ও স্কুল উদ্বোধন করার কথা সেখানে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন ।মানুষগুলো ছিল অত্যন্ত আন্তরিক । উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পর আমরা শিকদার বাড়ির ডালিমদের ঘরে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম । সুস্বাদু খাবারগুলোর প্রতিটি আইটেম প্রাকৃতিক উপায়ে তাদের নিজস্ব চাষকরা উপাদান থেকে প্রস্তুত করা হয়েছিল।

আমাদের পরের অনুষ্ঠান ছিল বাউফল উপজেলা প্রেস ক্লাবকে একটি কম্পিউটার হস্তান্তর করা । অনেকগুলো মোটরবাইক আমাদের সহযোগী হয়ে আমাদেরকে প্রেসক্লাবে নিয়ে গিয়েছিল ।একটি সুসংগঠিত আয়োজন এবং কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রায় দু’শ লোকের উপস্থিতিতে আমরা বাউফল প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকের কাছে কম্পিউটার হস্তান্তর করি । আমাদের পরবর্তী প্রোগ্রাম ছিল পটুয়াখালী প্রেস ক্লাব তাই আমরা বাউফল ছেড়ে চলে গেলাম । আমরা পটুয়াখালী প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সচিবকে একটি খুব আনন্দময় প্রোগ্রামে কম্পিউটার হস্তান্তর করেছিলাম যেখানে পটুয়াখালীর অনেক বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন ।পরে  সেখানকার জেলা প্রশাসক জনাব আমিতাব সরকার এবং পুলিশ সুপার জনাব সায়েদ মুশফিকুর রহমানের আমন্ত্রন পেয়ে তাঁদের বাসভবনে গিয়েছিলাম, উভয়ই সত্যিকারের ভদ্রলোক । আমরা প্রথমে জেলা প্রশাসক এর বাসভবন গিয়েছিলাম এবং তারপর গিয়েছিলাম পুলিশ সুপার এর বাসভবনে, উভয় স্থানে আমাদেরকে পৃথকভাবে উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়।

পটুয়াখালী’র জেলা প্রশাসক অমিতাব সরকার ও

পটুয়াখালী প্রেসক্লাব’র সভাপতি স্বপন কুমার সহ।

সুস্বাদু খাবারের সাথে তাদের অভ্যর্থনা, বিনয় এবং আতিথেয়তা ছিল অসাধারন । জেলা প্রশাসক আমিতাব সরকার বাইরে এসে পটুয়াখালী জেলার উন্নয়নে তাঁর অবদানগুলো দেখিয়েছিলেন, তিঁনি একটি নতুন ফোয়ারাও নির্মাণ করেছিলেন যা পটুয়াখালী শহরের সৌন্দর্যকে আলোকিত করেছে । বাংলাদেশে ২৭ টি জেলায় আমার সাম্প্রতিক ভ্রমণের সময় দেখা তিঁনি ছিলেন সবচেয়ে অসামান্য জেলা প্রশাসক । তিনি শুধুমাত্র একজন ব্যতিক্রমী অফিসারই নন, তিনি একজন মহান মানুষও ।আমরা পটুয়াখালীতে রাত কাটিয়ে ভোর ৫ টায় কুয়াকাটা দেখতে গেলাম, এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন সমুদ্র সৈকত হিসেবে পরিচিত । বঙ্গোপসাগরের পানিতে একই সাদা বালুকাময় সৈকত থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায় ।

আমরা সূর্যোদয় দেখেছি কিন্তু সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারিনি, কারণ আমাদের পরবর্তী কম্পিউটার হস্তান্তর প্রোগ্রামে যোগ দিতে বরিশাল প্রেস ক্লাব যেতে হয়েছিল । বরিশাল প্রেসক্লাবের অনুষ্ঠানটি অন্যরকম ছিল কারণ আমি বাংলাদেশে আসার আগে বিশিষ্ট সাংবাদিক জেড আই মামুন আমার সম্পর্কে এবং আমার প্রোগ্রাম সম্পর্কে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদককে জানিয়েছিলেন । বরিশাল তার জন্মস্থান এবং এই বিভাগে তিনি খুব জনপ্রিয় ।দর্শনীয় একটি প্রোগ্রাম শেষ করে আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে বরিশাল ত্যাগ করি ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*