তিস্তা সঙ্কট ও তার সমাধান

ডা. এস এ মালেক, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও কলামিষ্ট

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী
শেখ হাসিনা আগামী ২৫ শে মে ২ দিনের জন্য
ভারত সফরে যাচ্ছেন। এবার সফরের মূল উদ্দেশ্য পশ্চিম
বাংলার বীরভূম জেলায় অবস্থিত শান্তি নিকেতনে
বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান।
অবশ্য একই সময়ে সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদী উপস্থিত থাকবেন। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা
ব্যানার্জীতো থাকবেনই। পশ্চিম বাংলার গভর্ণরও থাকবেন। আর
থাকবেন ২ জন যাদের ডিলিট ও ডিএসসি উপাধিতে ভূষিত করা
হবে। শেখ হাসিনাকেও ডিলিট উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা
হবে। প্রশ্ন উঠেছে তিস্তার সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হবে কি
না। যে যাই বলুক না কেন আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা না হলেও
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও
পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করবেন
না এটা বিশ্বাস হয় না। যে কারণেই হোক তিস্তা সঙ্কট
বিলম্বিত হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের
মাটিতে দাঁড়িয়ে তিস্তা সঙ্কটের সমাধানের ঘোষণা
দিয়েছেন। তিনি বলেছেন তার শাসনামলেই তিস্তা সঙ্কটের সমাধান হবে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও তার প্রতিনিধিরা এ
পর্যন্ত যা বলেছেন তার সারমর্ম বোধহয় এরূপ। যেহেতু
বিষয়টি পশ্চিম বাংলার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট তাই পশ্চিম বাংলাকে বাদ
দিয়ে এই সমাধান দুরূহ। পশ্চিম বাংলার কতটুকু জল শেয়ার করবে
আর নিæে বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত ঐ নদীর পানি
কতটুকু বাংলাদেশ পাবে তা আলোচনার মাধ্যমে কেবল মীমাংসিত
হলেই তিস্তা সঙ্কটের সমাধান হতে পারে। ভারতের কেন্দ্রীয়
সরকারের কথায় যুক্তি আছে। ভারতে ফেডারেল ব্যবস্থা বিদ্যমান।
কয়েকটি বিষয় ছাড়া সবকিছুই প্রাদেশিক সরকার নিয়ন্ত্রণ
করে থাকে, তাছাড়া এটা এমন একটা বিষয় যেখানে জনগণের
স্বার্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট। তবে একথাও ঠিক পশ্চিম বাংলার
সরকারকে বিশেষ করে মমতা ব্যানার্জীকে এই সংকটে সমাধানের
পথে আগ্রহ সৃষ্টিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের মূল ভূমিকা পালন
করতে হবে। সঙ্কটের প্রকৃতি এমন যে দু’দেশের বিশেষ করে
পশ্চিম বাংলার সহযোগীতা ছাড়া এই সঙ্কট সমাধান খুবই
কঠিন। তাই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এই ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা
পালন করতে হবে। পশ্চিম বাংলার সরকারকে রাজি করার দায়িত্ব ভারতের
কেন্দ্রীয় সরকারের। তা সঙ্কটের সমাধানে সহযোগীতা বলে মনে
হয় না। মমতা তার নিজের দেশের মানুষের স্বার্থের কথা বেশি
চিন্তা করছেন এবং এই বিষয়টিকে একটি রাজনৈতিক ইস্যু
করে পশ্চিম বাংলার রাজনীতিতে তার প্রভাব বৃদ্ধি করতে চেয়েছেন।
তিনি যদি বলেন তিস্তার পানি পশ্চিম বাংলার লোকেরা ব্যবহার
করার পর বাংলাদেশে যতটুকু পৌঁছায় ওর থেকে বেশি দেওয়া সম্ভব
নয়। তাহলে পশ্চিম বাংলায় তার জনপ্রিয়তা বাড়লেও আর্ন্তজাতিক
আইনের দৃষ্টিতে তা অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
পৃথিবীতে ছোট-বড় যে নদীই হোক না কেন যখন তা বিভিন্ন
দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয় তখন প্রত্যেকটি দেশের ঐ দেশের
নদীর পানির উপর সমঅধিকার থাকে। পৃথিবীর সব জায়গায়
সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ আলোচনার মাধ্যমে তা মীমাংসা করে থাকেন।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে গঙ্গার পানি নিয়ে যেমন ভারত-
বাংলাদেশ মীমাংসা করেছে।

বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত ৫৪টি নদীর উৎস ভারতে।
তাই এই ৫৪টি নদীর পানির হিস্যা বাংলাদেশ ন্যায় সঙ্গতভাবে
দাবী করতে পারে। গঙ্গা ছাড়া আর কোন নদীর পানি দু’দেশ
সুসমভাবে বন্টন করতে পারেনি। ২য় নদী তিস্তার পানি এখন
আলোচনা চলছে তা সমাধান করতে যদি ৫ বছর কেটে যায় তাহলে
বাকী ৫২টা নদীর পানির হিস্যা পেতে আড়াই শত বছরের প্রয়োজন হবে।
তাছাড়া পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী একজন বাঙালী। শেখ হাসিনার সাথে
তার সম্পর্ক অত্যন্ত স্বাভাবিক। পৃথিবীর যেখানেই বাঙালী আছে
বাংলা ভাষা-ভাষী প্রতিটি মানুষের জন্য তার দরদ আছে। বাঙালীরা
পৃথিবীর যেখানেই বসবাস করুক না কেন তারা পারস্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ।
পশ্চিম বাংলার বুদ্ধিজীবী কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী
শিল্পীদের কাছাকাছি ভাষায় কথা বলে থাকেন। পারস্পরিক সম্পর্কে
তারা সংঘবদ্ধ। তাই মমতা ব্যানার্জী কেন বাংলাদেশের সাধারণ
মানুষের দুর্গতির কথা বিবেচনা করে এই সঙ্কট সমাধানে এগিয়ে
আসছেন না; তা বুঝা দুস্কর। পর্দার অন্তরালে থেকে অন্য কোনো
অশুভ শক্তি এ ব্যাপারে তৎপর আছে কি না কে জানে।
তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুধু পশ্চিমবঙ্গের
মুখ্যমন্ত্রী মমতার বিরুদ্ধে দায়িত্বে এড়িয়ে যাওয়ার
অভিযোগ তুললেই এই সঙ্কটের সমাধান কল্পে তার প্রতিশ্র“তি
এড়িয়ে যেতে পারেন না। মাননীয় মোদীর বক্তব্য অনুযায়ী তার
শাসনামলে এই সঙ্কটের সমাধান হবে এটাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
যে অশুভ শক্তি বাংলাদেশে ভারতের ভিতর সম্পর্কের অবনতি
ঘটাতে চায়; তারা কিন্তু তৎপর।

আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশের সরকার বিরোধী দল সমূহ এটাকে
হয়তো একটা ইস্যু হিসাবে ব্যবহার করতে চাইবে।
তাই বাংলাদেশের প্রত্যাশা নরেন্দ্র মোদী ও মমতা ব্যানার্জী
সম্মিরিতভাবে এই সমস্যার সঠিক সমাধানের জন্য এগিয়ে আসবে।
আর্ন্তজাতিক আইন অনুযায়ী ভারত নিশ্চয়ই এটা প্রত্যাশা করতে
পারে না যে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ পানির অভাবে মরুভূমি হয়ে যাক।
প্রয়োজনীয় শস্য ফলাতে ব্যর্থ হয়ে উত্তর বঙ্গের জনগণ অনাহারকৃষ্ট
হয়ে থাকুক। ভারত ও বাংলাদেশের ভিতর সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ।
দুই দেশ এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চায়। কিন্তু নদীর পানির
অংশীদারিত্বের মতো বিষয় অমীমাংসিত রেখে বন্ধুত্বের বন্ধন কি আরও
সুদৃঢ় করা সম্ভব। ভারত অবশ্যই অনুধাবন করে বাংলাদেশ একটা কৃষি প্রধান
দেশ। ভারত থেকে প্রবাহিত ৫৪টা নদী বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থার
প্রাণশক্তি। প্রয়োজন ও হিস্যা মতো পানি না পেলে বাংলাদেশের
অর্থনীতি তো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। ও সেই বিপর্যয়ের প্রভাব
ভারতের অর্থনীতিতেও পড়তে বাধ্য। তাছাড়া আর্ন্তজাতিক
পর্যায়ে প্রবাহিত নদী সমূহের পানি সুসম বন্টনের নীতি
জাতিসংঘে সংরক্ষিত। এরূপ প্রবাহিত একটা নদীর পানি যদি
এককভাবে কোনো দেশ ব্যবহার করতে চায় তাহলে আর্ন্তজাতিক
আইনের লঙ্ঘন। এরুপ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা
জাতিসংঘের রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ই প্রত্যাশা করে না যে
বন্ধু প্রতীম এ দুটো দেশের কোনো সঙ্কট সমাধানের জন্য
জাতিসংঘে যেতে। এতে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি
হতে পারে। বাংলাদেশ চায় শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবেশী
দেশসমূহের সাথে সহাবস্থান করতে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
প্রায়ই বলে থাকেন কোনো রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান
সংঘাত নয়; আলোচনার মাধ্যমে সব সমাধান সম্ভব। সঙ্কটের
সমাধান না হলে দু’দেশের বন্ধুত্বের কথা যতই বলা হোক না কেন
ক্ষতিগ্রস্ত জনগণ যারা পানির অভাবে ফসল ফলাতে ব্যর্থ হবে ও
সে কারণে অভূক্ত থাকবে তা জনগণের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য
হবে না। ফলে সরকার ভারতের পক্ষে কথা বললেও জনগণ বিপক্ষে অবস্থান
নেবে। দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে আসলে প্রয়োজন একে অপরের
সঙ্কট সমাধান সচেতনভাবে সহযোগীতা করবে। তাহলেই কেবল
দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক উন্নয়ন ঘটবে ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে তাঁর
প্রতিফলন ঘটবে। বাংলাদেশের মানুষ মনে করে বৃহৎ গণতান্ত্রিক
দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন; তা দ্রুত
কার্যকর হবে। ভারত নিশ্চয়ই চাইবে না যে, আগামী নির্বাচনে
তিস্তা একটা ইস্যু হবে এবং বিরোধী দল তার সুযোগ গ্রহণ
করবে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের যে মর্যাদা
অর্জন করেছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের
অবস্থানে পৌঁছানোর যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে
কাজ করছে, সেই জন্য অবশ্যই দুই দেশের নদ-নদীগুলোর পানি বন্টন
নীতি সুষ্ঠুভাবে সমাধানে পৌঁছানো অতীব যৌক্তিক ও অপরিহার্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*