রোহিঙ্গা সঙ্কট ও নিরাপত্তা পরিষদ

বিডিনিউজ প্রতিদিনঃ বর্তমান বিশ্বে যেসব মানবিক সঙ্কট রয়েছে; রোহিঙ্গা সঙ্কট তার অন্যতম। কোনো একটা দেশের সরকার সে দেশের জনসংখ্যার একাংশকে নির্মম নিপীড়নের মাধ্যমে বিতাড়িত করে, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সব কিছু দখল করে নিয়ে, এইরূপ দৃষ্টান্ত বর্তমান সময়ে খুব বেশি একটা দেখা যায় না। ৩ মাসে প্রায় ৭ লক্ষ রোহিঙ্গাদের আরাকান অঞ্চল হতে বিতাড়িত করা হয়েছে। বিতাড়নের সেই নির্মম কাহিনী গোটা বিশ্ব অবহিত হয়েছে।

কারণ হিসেবে বলা হয়েছে আরাকান রাজ্যে বিদ্রোহীরা না কি পুলিশ ফাঁড়ির উপর আক্রমণ চালিয়ে কয়েকজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সদস্যকে হত্যা করেছে। অবশ্য মিয়ানমার সরকারের এ বিবৃতি বিশ্ব জনমতের সাথে গ্রহণযোগ্য নয়। যে ধরনের আক্রমণের কথা ঐ বিবৃতিতে বলা হয়েছে তার ঘটাবার মত শক্তি ও সামর্থ্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নেই। তাছাড়া আরাকান বিদ্রোহী বলতে শুধু রোহিঙ্গাদের বোঝায় না। আরও কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্র“প আছে; যারা আর্ন্তজাতিক চক্রান্তের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তাই পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমণের কারণে রোহিঙ্গা লক্ষ লক্ষ জনগোষ্ঠীর ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে, অগণিত যুবতীদের ধর্ষণ করে, শিশু ও বৃদ্ধদের নির্মমভাবে হত্যা করে, জনসংখ্যার একটা অংশকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা কোন উপায়েই যুক্তিসঙ্গত বলে বিবেচিত হতে পারে না। অধিকাংশ রোহিঙ্গারাই ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

তাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মুসলমানদের দেশ বাংলাদেশ তাদের বিতাড়িত করতে পারে না। রোহিঙ্গাদের প্রতি ধর্মীয়গত কারণে বাংলাদেশের জনগণের দূর্বলতা থাকাই স্বাভাবিক। এর পরেও প্রায় চার দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ সরকার। এই সুদীর্ঘ সময়ে মাত্র দেড় থেকে ২ লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিক সে দেশে ফিরে গেছে। ফিরে গেছে বললে ভূল হবে। দেশের ভিতরে ও বাইরে যাওয়া আসা করেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের গন্তব্যস্থল বাংলাদেশ।

তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের কাছে অনেকটা সহনশীল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এবারের প্রসঙ্গটা একেবারেই ভিন্ন। মাত্র ৩ সপ্তাহের ব্যবধানে ৩ লাখ ও ১২ সপ্তাহে মোট ৭ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এরা পাশ্ববর্তী বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার ২টি উপজেলায় অবস্থান নিয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে এই ২ উপজেলায় মোট জনসংখ্যার চাইতে রোহিঙ্গা নাগরিকদের সংখ্যা বেশী। তাই অত্র এলাকায় অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম দিকে তারা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যবস্থা করলেও যেহেতু বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে তাই তারা এখন রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারণে এই বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গারা এখন বিভিন্ন ক্যাম্পে সুশৃঙ্খলভাবে জীবন যাপন করছে। খাদ্য সরবরাহ নিয়মিত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিছু কিছু রোহিঙ্গা নিজেরাই আয়-রোজগার করার চেষ্টা করছে। তাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না এই সঙ্কটের আশু সমাধান নেই। জাতিসংঘ চেষ্টা করেও সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

সমস্যা মিটিয়ে নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় একাধিকবার আলোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অংশগ্রহণের সময় বিষয়টি ৫ দফা প্রস্তাব আকারে উত্থাপন করেছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুটি উঠেছে। কিন্তু কোনো সমাধানের পথ খুঁজে এখনও পাওয়া যায়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ, মানবাধিকার সংগঠন, নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিবর্গ ও আর্ন্তজাতিক সাহায্য সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা স্বচক্ষে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে তাদের করুণ অবস্থা দেখে গেছেন। সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।

মিয়ানমার সরকারের প্রতি তারা রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নেয়ার আহŸান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি। প্রত্যাবাসনকারী ১০ হাজার রোহিঙ্গাদের একটি তালিকার মধ্য থেকে মাত্র ৭’শ রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফেরৎ নেয়ার কথা বলেছে মিয়ানমার সরকার। এই ধরনের উপহাস বার বার করা হচ্ছে, কথা দিয়ে চুক্তি করেও তা বাস্তবায়ন করছে না। জাতিসংঘের নির্দেশনার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করা হচ্ছে। পিছনে ২ মহাশক্তি আছে বলেই মিয়ানমার সরকার এই ধরনের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয়। সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৃহৎ প্রতিনিধিদল স্বচক্ষে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে তাদের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র পর্যবেক্ষণ করেছেন।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবে আপাতত তারা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে রাজি নন। এদিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে রোহিঙ্গা সঙ্কট এক ভয়াবহ সঙ্কট হয়ে দাঁড়িয়েছে। মোট ১২ লক্ষ লোকের খাদ্য, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তাসহ মৌলিক মানবিক বিষয়গুলি যোগান দিতে বাংলাদেশ সরকার হিমশিম খাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চল পাহাড়ী হওয়ায় দেখা দিয়েছে এক প্রাকৃতিক বিপর্যয়। এমনকি পার্বত্য অঞ্চলের প্রাণীকূলও আজ বিপর্যয়ের সম্মুখীন। পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে এবং বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হওয়ারও সম্ভাবণা দেখা দিয়েছে। এ কথা ঠিক জাতিসংঘ ও আর্ন্তজাতিক সাহায্য সংস্থা ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ মানবিক কারণে অর্থ, খাদ্য, পানীয়, ঔষধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সহায়তা হিসেবে অব্যাহত রেখেছেন।

কিন্তু অন্যান্য সবকিছুর চাপ বাংলাদেশের ওপর পড়ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে এই ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা নাগরিকদের সমস্যা-সঙ্কুল বিষয়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির সাথে যোগ হওয়ায় উন্নয়ন বাজেটের একাংশ রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে। সঙ্কট আরও দীর্ঘায়িত হলে আর কতদিন বাংলাদেশ এর দায় ভার বহন করবে। বাংলাদেশের ধীর ও স্থিতিশীল পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিশ্ব বিবেক আজ বাংলাদেশের পক্ষে। একমাত্র চীন ও রাশিয়া ছাড়া মিয়ানমার সরকারকে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে কেউ সরাসরি সমর্থ জানায়নি। এই দুই মহাশক্তিও রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে বিরোধীতা করছে বলে মনে হয় না। তারা বোধহয় সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সঙ্কটের সমাধান চান।

ভারতের সর্বশেষ দৃষ্টিভঙ্গি অনুকূল বলে মনে হচ্ছে। এই যখন বাস্তবতা সঙ্কটের সমাধানে দীর্ঘস্থায়ী হবে কেন? আর্ন্তজাতিক কোনো চক্রান্ত এই সঙ্কটকে দীর্ঘায়িত করার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছে কি না কে জানে। বাংলাদেশকে তাই ধৈর্য্যরে বাঁধ অতিক্রম করা চলবে না। যে শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশ অনুসরণ করে চলেছে; তা অব্যাহত রাখতে হবে। একমাত্র জাতিসংঘের মাধ্যমেই এই সঙ্কটের সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব। আর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘকে এই ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভরণপোষণের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে নিতে হবে।

আর যদি এমন দেখা যায় সকল রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরৎ নেওয়া যাচ্ছে না; তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে কম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা রয়েছে, সেই সকল স্থানে রোহিঙ্গাদের জাতিসংঘ কর্তৃক পুর্নবাসন করা যায় কি না তা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে মিয়ানমার যদি কোন অবস্থাতেই রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং জাতিসংঘ যদি এ ব্যাপারে সফল ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিশ্বে এক অবাঞ্ছিত নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত হয়ে থাকবে।

এর পর বিশ্বের যে সব দেশে সংখ্যালঘু স¤প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে, তাদের প্রয়োজনবোধে ঐ সব দেশের সরকার একইভাবে বিদেশে তাড়িয়ে দেবে (এথনিকক্লিনজিং) সম্ভব করে তুলবে। এটা হবে বিশ্ব শান্তির জন্য এক ভয়াবহ বিপর্যয়। শক্তিশালী দেশসমূহ এর থেকে রেহাই পাবে না। তাই জাতিসংঘের উচিৎ কালক্ষেপণ না করে রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে মিযানমার সরকারকে বাধ্য করা। একটা দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে, অমানবিক আচার-আচরণের কারণে, কেন আরেকটা দেশ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে যাবে। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের প্রতি যে মানবিক আচরণ প্রদর্শণ করেছেন; বিশ্বের ইতিহাসে তা এক বিরল ঘটনা।

জাতিসংঘের উচিৎ মমতাময়ী শেখ হাসিনার এই মানবতার প্রতি সম্মানপ্রদর্শন করা ও সর্বরকম সাহায্য সহযোগীতা বাংলাদেশকে দেওয়া; এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে মুক্তি দেওয়া। বাংলাদেশ অতিরিক্ত জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটা উন্নয়নশীল দেশ। দ্রুত উন্নয়ন ও অগ্রগতির দিকে দেশটি ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেটের একাংশ দেশের বর্হিভূত খাতে ব্যবহৃত হোক এটা বাংলাদেশের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ সরকার ইতিপূর্বেই যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পূরণ হবার নয়।

তাই ভবিষ্যতে যেন এই সঙ্কট দীর্ঘায়িত না হয। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার ও জনগণ খুবই উদ্বিগ্ন। সঙ্কটের প্রকৃতি যতই গভীরে হোক না কেন, নিরাপত্তা পরিষদের উচিৎ, এখনই দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এই সঙ্কট নিরসনের ব্যাপারে প্রস্তাব গ্রহণ ও বাস্তবায়ণ করা। ইতিপূর্বেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখন কালবিলম্ব না করে নিরাপত্তা পরিষদের উচিৎ যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম চাপ মায়ানমারের ওপর সৃষ্টি করতে না পারলে (অবরোধ) মায়ানমার সরকারকে বশে আনা সম্ভব নয়। সে দেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে এ ব্যাপারে যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতিসংঘের উচিত অনুপ্রাণিত করা। মায়ানমারের সামরিক সরকারের কাছে জাতিসংঘের মাথা নত করা উচিত নয়।

মনে রাখা দরকার এতদঅঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রামের মতো কোনকিছু শুরু হলে তার শেষটা হবে ভয়াবহ, অশান্ত হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। দেখা যাক, নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দল জাতিসংঘে ফিরে গিয়ে এর সুষ্ঠু ও সঠিক সমাধানের উপায় বের করতে সক্ষম হন কি না। সেই প্রতীক্ষায় বাংলাদেশ।

ডা. এস এ মালেক, বিশিষ্ট রাজনৈতিক ও কলামিষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*