বর্তমান কোটা সংকট ও অস্থিরতার মূল কারণ

বিডিনিউজ প্রতিদিনঃ একটা গণতান্ত্রিক দেশে আন্দোলন কোন নতুন ইস্যু নয়। আন্দোলনের অর্থ হচ্ছে- গণঅসন্তোষকে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া। সবসময় গণঅসন্তোষ আন্দোলনের কারণ নাও হতে পারে। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে আন্দোলন, বিশেষ করে সরকারবিরোধী আন্দোলন উদ্দেশ্যমূলকভাবে গড়ে তোলা হয়।

কিন্তু আন্দোলনের উৎস যখন গণঅসন্তোষ, তখন তা গুরুত্বের সাথে দ্রুত বিবেচনায় নেওয়া উচিৎ। প্রথমে অনুধাবন করা, আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও যৌক্তিকতা। আন্দোলন যদি যৌক্তিক হয়, তাহলে কালক্ষেপণ না করে আন্দোলনকারীদের সাথে যথাসময়ে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা। যত দেরি হবে, তত বেশি সংখ্যক লোক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হবে। এবার সরকারি চাকুরিতে কোটা নিয়ে যে আন্দোলন হচ্ছে- তার পিছনে যুক্তি আছে বলে অনেকই মনে করেন। যে দেশে ৫ টি শূন্য পদে বিজ্ঞপ্তি দিলে ৫ হাজার লোক আবেদন করেন, এরূপ কর্মসংস্থানের হাহাকার, সে দেশে যে কারণেই হোক না কেন, মাত্রাতিরিক্ত কোটা ব্যবস্থা গণঅসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।

এ দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিুবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা তাদের সন্তানদের অতি কষ্ট করে লেখাপড়ার ব্যয় বহন করেন, এই আশায় যে লেখাপড়া শিখলে অন্ততঃ একটা চাকুরির ব্যবস্থা হবে ও বৃদ্ধ বয়সে সন্তানরা সংসার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। এটাই এদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। শিক্ষার্থীরাও এরূপ প্রত্যাশা নিয়েই লেখাপড়া করে। কিন্তু যখন দেখা যায়, লেখাপড়া শেষ করে বড় বড় কয়েকটা ডিগ্রী নিয়ে বছরে পর বছর বেকার থাকতে হচ্ছে- একটা পর্যায়ে দরখাস্ত করার সুযোগও শেষ হয়ে যায়। তখন তাদের হতাশা পেয়ে বসতেই পারে। যেসব কারণে ওই হতাশার সৃষ্টি তার বিরুদ্ধে গণআন্দোলন করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আসলে কোটা ব্যবস্থা কেন প্রবর্তন করা হলো, তার পিছনে অনেক যুক্তি রয়েছে।

যে দেশটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে, সে দেশে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ও তাদের ছেলেমেয়েদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া, এটা কোন অযৌক্তিক কিছু নয়। তবে এটাও সত্য, এই সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাত্রা কতটুকু যুক্তিসংগত এবং কত দিন তা কার্যকর রাখা প্রয়োজন, তা নিয়ে বিতর্ক ও মতপার্থক্য সৃষ্টি হতেই পারে। চাকুরির বাজারে যে মহাসংকট, তাতে করে যারা চাকুরি পাচ্ছেন না, তাদের বিক্ষুব্ধ হওয়া স্বাভাবিক। আর এই বিক্ষুব্ধতার প্রকাশ ঘটে, বিক্ষোভের মাধ্যমে।

বর্তমান কোটা পদ্ধতি নিয়ে সারা দেশে যে গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, তার মূল কারণই এটা। যখনই একজন চাকুরি প্রার্থী দেখছেন, কোটার অংশ ৫৬%, তখন কি কি কারণে ওই ৫৬% কোটা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, তার প্রকৃত হিসাব না নিয়েই এবং ওই ৫৬ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা থাকলেও প্রকৃত অর্থে বিশেষ করেমেধাভিত্তিক নিয়েগের ক্ষেত্রে যে খুব বেশি একটা বৈষম্য না করে তার মনে এই ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, সংরক্ষিত কোটা পদ্ধতির কারণেই তিনি চাকুরি পাচ্ছেন না। প্রকৃত হিসাব নিলে মেধাভিত্তিক চাকুরির ক্ষেত্রে খুব বড় একটা বৈষম্য হচ্ছে বলে মনে হয় না।

অন্যান্য ক্ষেত্রে শতকরা ৫৬ ভাগ চাকুরি যদি বিশেষ বিশেষ শ্রেণির জন্য নির্ধারিত থাকে, তাহলে একজন সাধারণ প্রার্থীর কাছে তা তো অসংগত মনে হবে। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে- যখনই কোটাভিত্তিক যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় না, তখনই তা মেধাভিত্তিক বিবেচনায় নিয়ে চাকুরি দেওয়া হয়ে থাকে। এটা অনেক সময় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জানার কথা নয়। তাছাড়া পৃথিবীর বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে সমাজের দুর্বল শ্রেণির যারা পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য চাকুরির বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে। সেই পাকিস্তান আমলেও শিডিউল কাস্টের লোকদের এই সুবিধা দেওয়া হতো।

বর্তমান কোটাভিত্তিক আন্দোলন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, সে পর্যায়ে পৌঁছার আগেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিৎ ছিল শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনায় বসা। প্রাথমিক পর্যায়ে আন্দোলনের গুরুত্ব সঠিকভাবে বুঝতে না পারায় ও কিছু ভুল পরামর্শের কারণে হয়তো সরকারের উপলব্ধিতে পৌঁছাতে বেশ কিছু দেরি হয়েছে। আসলে আমাদের দেশে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর না হওয়া পর্যন্ত কোন মন্ত্রণালযের কোন সমস্যা সমাধান হওয়া দেখা যায়নি। ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায়, প্রথম দিকে ঘুমিয়ে থেকে পরে বিশেষভাবে জেগে ওঠেন।

ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার তা হযে যায়। প্রথমেই সরকারকে অনুধাবন করা উচিৎ, কোন আন্দোলন সঠিক ও যৌক্তিক, কোন আন্দোলন দ্রত বেশি দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের কারণ যদি ষড়যন্ত্রমূলক হয়, তা হলে সরকারের উচিৎ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। আর আন্দোলনের কারণ যদি সাধারণ জনগণের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, তাহলে প্রথম দিকে গুরুত্ব দিয়ে আন্দোলন থামিয়ে দেওয়া। বর্তমান আন্দোলনের এই কাজটি করা হয়নি বলে মনে হয়। তাই এতো বিপর্যয়। কোটা পদ্ধতি কেন, কি কারণে কতটুকু কার্যকর আছে, তা আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা দরকার। ছাত্র সমাজ মানেই সচেতন ও সংবেদনশীল জনগোষ্ঠী।

যেকোন কারণে অতি সহজে তারা আন্দোলনমুখী হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই স্বাভাবিক আন্দোলনে ষড়যন্ত্রকারীদের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে এবং এই সুযোগ নিয়ে বিশেষ মহল এমনকি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ আন্দোলনকারীদের উস্কিয়ে দিয়ে এমন কিছু ঘটাতে পারেন, যার সাথে মূল আন্দোলনের কোন সম্পৃক্ততা নেই। মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবনে গভীর রাতে যে নিষ্ঠুর ও অমর্যাদাকর ঘটনা ঘটানো হয়েছে, তা এরূপ ষড়যন্ত্রের পরিণতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামানকে যারা চিনেন, তারা ভালো করেই জানেন, তিনি একজন সৎ ব্যক্তি।

শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়মুখ। কোন বিরোধ দেখা দিলেই তিনি বলপ্রয়োগের নীতি তিনি অণুসরণ করেন না। তিনি উপাচার্য হওয়ার পর এই নীতি অনুসরণ করেই চলেছেন। তিনি শিক্ষক, তাই ছাত্রদের সাথে সৌহার্দমূলক আচরণে অভ্যস্ত। পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে ছাত্রদের সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব নয়। ছাত্র আন্দোলন হচ্ছে রাজপথে। একটা পর্যায়ে পুলিশের সাথে তাদের সংঘাত হয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে গভীর রাতে উপাচার্যের বাসভবনে ঢুকে সবকিছু ভাংচুর ও উপাচার্যকে লাঞ্ছনার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর সাথে বর্তমান আন্দোলনের সম্পর্কটা কি ? রাজপথে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছে, কোটা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে। উপাচার্যের বাসভবনে ঢুকে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি তারা কি কারণে করেছে, এর তদন্তপূর্বক সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের দ্রুত কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা।

একটা মহল এই সুবাদে বিশেষ করে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়, তখন সরকারের উপর সব দোষ চাপিয়ে দিতে চাইছে। তাদের মতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাত্রাতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে শুধু সরকার নয়, স্বাধীনতার স্বপক্ষের লোকজন উপকৃত হচ্ছে। এভাবেই তারা সাধারণ ছাত্র আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করার চেষ্টা করছে। আর করছে বলেই উপাচার্যের বাসভবনে এভাবে আক্রমণ করা হযেছে। বিরোধী দল থেকে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, তা উস্কানিমূলক। তারাওতো দীর্ঘ ১৫-১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।

’৭৫ এর পর হতে দীর্ঘ ’৯৬ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সরকারি চাকুরির সুযোগ হতে বঞ্চিত ছিল। বিশেষ করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের চাকুরি পাওয়ার কোন সুযোগই ছিল না। এখনতো সকলের জন্য কোটা নির্ধারিত হয়েছে। ৫৬ ভাগের ভিতর মুক্তিযোদ্ধা, দুর্বল শ্রেণি ও প্রতিবন্ধি রয়েছে। আর স্বৈরশাসনের আমলে তো তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হতো, মেধার কোন বিষয় ছিল না। ইচ্ছামতো বিএনপি ওজাতীয় পার্টির দলীয় পরিচয়ে চাকুরি দেওয়া হতো। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর গোলাম আজমের ছেলে সেনাবাহিনীতে উচ্চ পর্যায়ে চাকুরিরত ছিলেন। শেখ হাসিনা জানতেন যে, দক্ষতা ও যোগ্যতায় তিনি চাকুরি পেয়েছেন।

তাই তাকে বে-আইনীভাবে চাকুরিচ্যুত করা হয়নি। একবার হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ডাক্তার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম স্থানলাভ করেছিল একজন জামাআতে ইসলামী সমর্থিত ছেলে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাকেতো চাকুরি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি ? বর্তমান আন্দোলনের ব্যাপারে যদি সরকার প্রধানকে সঠিক সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিষয়টি অবগত করাতেন, তাহলে বর্তমান সংকটের সৃষ্টি হতো না। সকলই আশা করছে, প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের পর বিরাজমান সংকটের প্রকৃত সমাধান ঘটবে। এ ব্যাপারে সকলকেই ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

ডাঃ এস এ মালেক, বিশিষ্ট রাজনীতিক ও কলামিষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*